জোড়াসাঁকোর নোপানি হাইস্কুলে সরস্বতী পুজো, প্রাক্তনী ও পড়ুয়াদের মিলনমেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

নিজস্ব চিত্র

কলকাতার জোড়াসাঁকো অঞ্চলে অবস্থিত ৭২ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নোপানি হাইস্কুলে ভক্তি, আনন্দ আর সাংস্কৃতিক আবহে উদযাপিত হল সরস্বতী পুজো। বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে গোটা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ জুড়ে সৃষ্টি হয় এক আন্তরিক, পবিত্র ও উৎসবমুখর পরিবেশ। পড়ুয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক থেকে শুরু করে প্রাক্তনীদের উপস্থিতিতে স্কুল প্রাঙ্গণ যেন হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত মিলনক্ষেত্র।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বর্তমান প্রজন্মের ছোট ছোট খুদে পড়ুয়াদের কণ্ঠে মা সরস্বতীর বন্দনার মাধ্যমে। নিষ্পাপ কণ্ঠে প্রার্থনা আর ভক্তির আবেশে শুরু হওয়া এই আয়োজন ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসবে। পরে একে একে নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয় ছাত্রছাত্রীরা। শিশুদের সরল, স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক পরিবেশনা উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায়। দর্শকাসনে বসে থাকা অভিভাবক ও অতিথিদের চোখেমুখে ছিল গর্ব আর আবেগের ছাপ।

এই বছরের সরস্বতী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের উপস্থিতি। দেশ-বিদেশে কর্মরত বহু প্রাক্তনী এই বিশেষ দিনে স্কুলে ফিরে এসে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান প্রজন্মের পড়ুয়াদের সঙ্গে তাঁদের আলাপচারিতা, উৎসাহ ও অভিজ্ঞতার ভাগাভাগিতে তৈরি হয় এক আবেগঘন প্রাক্তনী–বর্তমান মিলনমেলা। পুরনো স্মৃতি, শৈশবের গল্প আর বিদ্যালয়ের দিনগুলির কথা ফিরে আসে সেই মুহূর্তে, যা অনুষ্ঠানের আবহকে আরও গভীর করে তোলে।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিব্যেন্দু সেন শর্মা জানান, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র পুজো উদযাপন নয়। ছেলে-মেয়েরা যাতে সঠিক পথে নিজেদের পরিচালিত করতে পারে, আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে— সেই উদ্দেশ্যেই মা সরস্বতীর বন্দনার মাধ্যমে তাদের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনা গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে চরিত্র গঠন ও মূল্যবোধ তৈরিই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসল দায়িত্ব, আর এই ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সেই বীজ বপন করা সম্ভব। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সরস্বতী পুজোর মতো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শুধু শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চাই নয়, মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের বিকাশও সম্ভব হয়। স্কুলের পরিবেশে এই ধরনের উৎসব শিশুদের মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

এই বিশেষ দিনটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে দ্বাদশ শ্রেণি পাস আউট পড়ুয়াদের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান। আবেগঘন পরিবেশে তাঁদের বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ছোটদের চোখে ছিল শ্রদ্ধা, বড়দের চোখে ছিল স্মৃতি আর কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আশীর্বাদ, সহপাঠীদের শুভেচ্ছা আর বিদ্যালয়ের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে তারা নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

সব মিলিয়ে, নোপানি হাইস্কুলের সরস্বতী পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আয়োজন হয়ে থাকেনি— তা হয়ে উঠেছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আবেগ এবং প্রজন্মের সংযোগের এক সুন্দর নিদর্শন। জোড়াসাঁকোর এই প্রাচীন বিদ্যালয়ে বিদ্যার দেবীর আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠল মানবিকতা ও আদর্শ মানুষ গড়ার এক গভীর বার্তা।