বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে আপাতত স্পিকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখল কলকাতা হাইকোর্ট। তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আর্জি খারিজ করে ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিল, বিধানসভার স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই মুহূর্তে অধ্যক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হবে না।
তবে স্পিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। বেঞ্চের মতে, ‘সঠিক পদ্ধতি’ ছিল—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, দু’পক্ষকেই ডেকে তাঁদের বক্তব্য শোনা। তার পরেই বিরোধী দলনেতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।
ফলে আপাতত বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার চেয়ারে থাকছেন ঋতব্রতই। তবে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। বিচারপতি কৃষ্ণ রাওকে আগামী দু’মাসের মধ্যে মূল মামলাটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী দু’মাসের মধ্যে সিঙ্গল বেঞ্চই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা থাকবেন কি না।
স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলেন তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি ছিল, রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে স্পিকার একতরফাভাবে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিষদীয় দলের নেতা কে হবেন, তা নির্ধারণ করার অধিকার রাজনৈতিক দলের। দলের সিদ্ধান্তই বিধানসভায় কার্যকর হওয়া উচিত।
অন্যদিকে স্পিকারের পক্ষে সওয়াল করে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল জানান, ৫৮ জন বিধায়ক স্বাক্ষর করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন থাকায় স্পিকারের সিদ্ধান্তে কোনও অসঙ্গতি নেই।
মামলার শুনানিতে একাধিক প্রশ্নও তোলে আদালত। ৯ মে প্রথম চিঠি, ১৫ মে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯ মে ফের চিঠি এবং পরে ৩ জুন ঋতব্রতকে স্বীকৃতি—পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ১৮ মে সর্বসম্মত বৈঠক হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে সেই বৈঠক হয়নি বলেও আদালতকে জানানো হয়। পরে সই জাল সংক্রান্ত অভিযোগও ওঠে।
আদালতের প্রশ্ন ছিল, প্রথম চিঠির পর দ্বিতীয় চিঠির ভিত্তিতে কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? পাশাপাশি সই জাল সংক্রান্ত অভিযোগের যথাযথ যাচাই হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। ‘৫৮ বেশি, না ৭৮ বেশি—কোনটা ঠিক?’—এই প্রশ্নে মামলার জটিলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শুনানিতে মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডে বনাম উদ্ধব ঠাকরে মামলার প্রসঙ্গও টানেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর যুক্তি, রাজনৈতিক দলই মূল, পরিষদীয় দল তার পরে।
অন্যদিকে ঋতব্রতের আইনজীবী জয়দীপ করের দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন যাচাই করেই স্পিকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫৮ জনের মধ্যে ৫৬ জনের উপস্থিতিতে সমর্থন এবং পরে আরও দু’জনের সম্মতি—সব মিলিয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্তে কোনও ভুল নেই বলেই তাঁর যুক্তি।
সব মিলিয়ে আদালতের নির্দেশে আপাতত স্বস্তি ঋতব্রত শিবিরে। শোভনদেবের অন্তর্বর্তী আবেদন খারিজ হলেও স্পিকারের সিদ্ধান্তের পদ্ধতি নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর সিঙ্গল বেঞ্চে—আগামী দু’মাসের মধ্যে বিরোধী দলনেতার চেয়ারে শেষ পর্যন্ত কে থাকবেন, তার চূড়ান্ত ফয়সালা সেখানেই।