বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে রেশন আমজনতার অন্যতম বড় চাহিদা। কোভিডের সময়ে রেশনের বরাদ্দই বহু মানুষকে চরম খাদ্যসঙ্কট থেকে বাঁচিয়েছে। বদলের বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার আসার পর স্বভাবতই কেন্দ্রের একটি বিশেষ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (Pradhan Mantri Garib Kalyan Anna Yojana-PMGKAY) প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে কোটি কোটি দরিদ্র পরিবারকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আগামী ৫ বছরের জন্য (অর্থাৎ ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত) এই যোজনার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের প্রায় ৮১.৩৫ কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) জোগাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গেও এই প্রকল্পের বিস্তার চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এ রাজ্যে এই সুবিধা পাওয়ার প্রকৃত শর্তগুলি কী কী? কার্ড থাকলেই কি মিলবে নিখরচায় চাল-গম, নাকি আবেদনের রয়েছে বিশেষ মারপ্যাঁচ? নিচে তার সম্পূর্ণ ও যুক্তিসম্মত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।
কারা পাবেন এই সুবিধা? যোগ্যতার আসল মাপকাঠি
প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনার সুবিধা পেতে গেলে সবথেকে বড় এবং প্রাথমিক শর্ত হলো আবেদনকারীকে অবশ্যই জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের (National Food Security Act-NFSA) আওতাভুক্ত হতে হবে। মূলত দুই ধরনের রেশন কার্ড হোল্ডাররা এই সুবিধা পেয়ে থাকেন:
- অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (AAY): এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলি প্রতি মাসে পরিবার পিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ (সাধারণত ৩৫ কেজি) খাদ্যশস্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পান।
- অগ্রাধিকার প্রাপ্ত পরিবার (PHH): এই তালিকায় থাকা পরিবারগুলির ক্ষেত্রে মাথাপিছু ৫ কেজি করে খাদ্যশস্য (চাল অথবা গম) প্রতি মাসে বিনামূল্যে বরাদ্দ করা হয়।
বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন যাঁরা:
- বিধবা বা মরণাপন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যিনি পরিবারের প্রধান, অথচ উপার্জনের কোনো স্থায়ী উৎস নেই।
- ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক যাঁদের সামাজিক বা পারিবারিক কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেই।
- ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক (Landless Agricultural Laborers), প্রান্তিক চাষি এবং গ্রামীণ কুটিরশিল্পী (যেমন কামার, কুমার, তাঁতি ইত্যাদি)।
- বস্তিবাসী এবং দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, যেমন কুলি, রিকশাচালক বা হকার।
এ রাজ্যে রেশনের বরাদ্দ ও কোটা কত?
পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের (Department of Food and Supplies, Govt. of West Bengal) তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধাভোগীর সংখ্যা বিশাল। এ রাজ্যে ‘এএওয়াই’ (AAY) এবং ‘পিএইচএইচ’ (PHH) ক্যাটাগরি মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটিরও বেশি মানুষ এই রেশন ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। রাজ্য ভেদে খাদ্যশস্যের বণ্টনে কিছুটা হেরফের হয়; যেমন কিছু রাজ্যে গম দেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে মূলত চাল ও আটার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয় পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম বা পিডিএস (Public Distribution System-PDS) ব্যবস্থার মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: আবার চালু উৎসশ্রী পোর্টাল, চার বছর পর জট কাটিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বদলি শুরু
আবেদনের পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আপনার যদি ইতিমধ্যে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির (AAY বা PHH) ডিজিটাল রেশন কার্ড থাকে, তবে নতুন করে কোনও আবেদন করার প্রয়োজন নেই। আধার লিঙ্কযুক্ত সেই কার্ড নিয়ে সরাসরি নিকটবর্তী রেশন দোকানে গেলেই বিনামূল্যে বরাদ্দ খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা যাবে।
তবে যাঁদের কার্ড নেই বা যারা নতুন করে এই তালিকায় নাম তুলতে চান, তাঁদের সাধারণ রেশন কার্ডের আবেদন করতে হবে।
অনলাইন আবেদনের সহজ ধাপ:
- প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য দপ্তরের পোর্টালে (wb.gov.in) যেতে হবে।
- সেখানে মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি (OTP)-র মাধ্যমে লগ-ইন করতে হবে।
- নতুন কার্ড বা ক্যাটাগরি পরিবর্তনের নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপলোড করতে হবে।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস (Required Documents):
- চালু রেশন কার্ড (যদি থাকে)।
- পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আধার কার্ড (Aadhaar Card)।
- ঠিকানার প্রমাণপত্র বা রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট (Address Proof)।
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং চালু মোবাইল নম্বর।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কেন্দ্র সরকারের ‘ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড’ (One Nation One Ration Card – ONORC) নিয়মের ফলে দেশের বা রাজ্যের যে কোনও প্রান্তের মানুষ নিজের আধার বায়োমেট্রিক যাচাই (fingerprint or iris authentication) করে তাঁর ন্যায্য রেশন সংগ্রহ করতে পারবেন।