জেলের অন্দরে কি সক্রিয় ছিল গোপন যোগাযোগের জাল? আফতাবের সেল ঘিরে গোয়েন্দাদের নজরে নতুন রহস্য

PIC- AI

প্রেসিডেন্সি জেলের ১৪ নম্বর সেল থেকে মাঝেমধ্যেই মিলছিল কিছু যান্ত্রিক সংকেত। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র খুঁজে পায়, সেই সংকেত আসছে জেলের ১৪ নম্বর সেল থেকেই। তদন্তে নেমে গোয়েন্দাদের হাতে আসে মোবাইলের টাওয়ারের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য। আর সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় অচেনা সংকেতের উৎস খোঁজার কাজ।

প্রেসিডেন্সি জেলের আধিকারিকদের মোবাইলের টাওয়ারের অবস্থানের সঙ্গে একটি অপরিচিত নম্বরের অবস্থান মিলে যেতেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এরপরই তৎপর হয়ে ওঠে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুরু হয় তল্লাশি। ১৪ নম্বর সেলে কে থাকেন, তা জানতে চাওয়া হলে জেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই সেলের আবাসিক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফতাব আনসারি।

এর পরেই আফতাব আনসারির সেলে শুরু হয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি। পুলিশ সূত্রের খবর, গত রবিবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট নাগাদ এক ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকের নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু হয়। জেলের বিভিন্ন সেলে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বিশেষ নজর ছিল আফতাবের সেলের দিকে। রাত ৮টা ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে অভিযান।


তল্লাশিতে আফতাব আনসারির সেল থেকে উদ্ধার হয় একাধিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তিনটি মোবাইল ফোন, যার মধ্যে একটি আইফোন বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি মিলেছে দু’টি জিও রাউটার, তিনটি জিও সিমকার্ড, তিনটি ওটিজি পেনড্রাইভ, ১২৮ জিবির একটি সাধারণ পেনড্রাইভ এবং একটি হেডফোন। জেলের মতো কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এতগুলি বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম কী ভাবে আফতাবের সেলে পৌঁছল, তা নিয়েই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনগুলির মাধ্যমে গত কয়েক দিনে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা শুরু করেছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় কোন কোন নম্বরে ফোন করা হয়েছিল, সেই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ফোনের কথোপকথন, যোগাযোগের ধরন এবং উদ্ধার হওয়া অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

২০০২ সালে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে হামলার ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল আফতাব আনসারির। ওই হামলায় জঙ্গিদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে কলকাতা পুলিশের চার কনস্টেবল নিহত হন। ঘটনার কয়েক দিন পর ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় সেলিম ও জাহিদ নামে দুই সন্দেহভাজন জঙ্গির। তদন্তকারীদের দাবি, মৃত্যুর আগে তাঁরা আমেরিকান সেন্টারে হামলার মূল অভিযুক্ত হিসেবে আফতাব আনসারির নাম জানিয়েছিলেন।

আফতাবের বিরুদ্ধে হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জুতো প্রস্তুতকারক সংস্থা খাদিমের কর্তা পার্থ রায় বর্মণকে অপহরণের ঘটনাতেও তার নাম জড়িয়েছিল। দুবাই থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আমেরিকান সেন্টারে হামলা-সহ একাধিক মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, জেলে থাকার সময়ও আফতাব পাকিস্তানের জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। সেই যোগাযোগ কী ভাবে চলত, কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করত এবং সম্প্রতি তার সেল থেকে উদ্ধার হওয়া বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম সেই যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হত কি না, এখন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যেই গত দু’মাসে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের তৎপরতায় একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্য গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। ধৃতদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জেরা করে রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল তাদের যোগাযোগের ধরন এবং গতিবিধি সম্পর্কে একাধিক তথ্য পেয়েছে বলে সূত্রের খবর। সম্ভাব্য গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাংলায় নাশকতার কোনও পরিকল্পনা ছিল কি না, সেই বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আফতাব আনসারির সেল থেকে এতগুলি বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা তদন্তকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জেলের ভিতর থেকে আফতাব কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কাদের কাছে তথ্য পাঠানো হত এবং ওই সরঞ্জামগুলি ঠিক কী কাজে ব্যবহার করা হত—তার উত্তর খুঁজতেই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, নতুন তথ্য সামনে আসার পর অতীতে আফতাব আনসারির সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিদের তালিকাও নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও অন্যান্য যন্ত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনও পরিচিত বা অচেনা নম্বরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ মেলে কি না, তা দেখছেন তদন্তকারীরা। জেলের ভিতর থেকেই কোনও গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছিল কি না, কিংবা বাইরের কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ঘটনার তদন্তে পুলিশের সাইবার শাখার সাহায্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, রাউটার, পেনড্রাইভ, সিমকার্ড-সহ অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ফরেন্সিক পরীক্ষা করা হতে পারে। সেগুলিতে থাকা তথ্য, যোগাযোগের বিবরণ, সংরক্ষিত নথি এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও সূত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে।

এর আগে গত ২০ অগস্ট রাত পৌনে ৮টা নাগাদ প্রেসিডেন্সি জেলে আরও এক দফা তল্লাশি চালানো হয়েছিল। সেই অভিযানে বিচারাধীন বন্দি আব্দুল মইনুদ্দিনের কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন এবং একটি সিমকার্ড উদ্ধার হয়। দু’টি পৃথক ঘটনায়ই কারা কর্তৃপক্ষের তরফে হেস্টিংস থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

পরপর জেলবন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় প্রেসিডেন্সি জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এত কড়া নজরদারির মধ্যে কী ভাবে এই সরঞ্জামগুলি জেলের ভিতরে ঢুকল, কারা সেগুলি পৌঁছে দিল এবং সেগুলি ব্যবহার করে কোনও নিষিদ্ধ যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছিল কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন তদন্ত এগোচ্ছে।