শাস্ত্র, সংগীত ও সাম্যের মেলবন্ধনে দুর্গাপুজো, নারী পৌরোহিত্যে স্বতন্ত্র ‘শুভমস্তু’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রচলিত ধারণাকে পাশে সরিয়ে রেখে পৌরোহিত্যের জগতে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছেন নন্দিনী ভৌমিক। তাঁর এই পথচলার অনুপ্রেরণা ছিলেন শিক্ষিকা গৌরী ধর্মপাল। সংস্কৃত ও বৈদিক বিবাহের রীতিনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েই পৌরোহিত্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় নন্দিনীর। পরবর্তীকালে সেই আগ্রহ থেকেই গড়ে তোলেন মহিলা পুরোহিতদের দল ‘শুভমস্তু’। বিবাহ, অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করে এই দল।

২০২১ সালে দক্ষিণ কলকাতার ৬৬ পল্লির দুর্গাপুজোয় নন্দিনী ভৌমিক ও তাঁর সহযোগীদের পৌরোহিত্য বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। প্রচলিত দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে মহিলা পুরোহিতদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন করে প্রশ্ন তোলে নারী-পুরুষের পৌরোহিত্যের অধিকার নিয়ে। নন্দিনীর বক্তব্য, পুরোহিত হওয়ার অধিকার পুরুষের যেমন রয়েছে, নারীরও তেমনই রয়েছে। শাস্ত্রেও এ বিষয়ে কোনও বাধা নেই বলেই তাঁর মত।

হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নারীদের মন্ত্রোচ্চারণ ও উপবীত ধারণের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। ঋতুমতী নারীদের ঘিরেও প্রচলিত রয়েছে একাধিক সামাজিক ট্যাবু। এই প্রসঙ্গে নন্দিনীর বক্তব্য, “ওটা তখনকার সময়ের ইতিহাস। আমরা যখন ঋতুমতী হই, তখন অশুচি দূরের কথা, সেটা উৎসবের দিন হওয়া উচিত। মাতৃত্ব এত সুন্দর তো ঋতুর জন্যই। সুতরাং শুচিতা অন্তরে, দেহে নয়।”


শুভমস্তুর দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণের পাশাপাশি তার বাংলা অর্থ ব্যাখ্যা করা। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তুলতে মন্ত্রপাঠের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলা গান ও রবীন্দ্রসংগীত। ফলে শাস্ত্রীয় রীতির পাশাপাশি সংগীতের মূর্ছনায় মণ্ডপে তৈরি হয় এক স্বতন্ত্র আবহ।

নন্দিনীর ভাবনায়, মা দুর্গা প্রকৃতিরই প্রতীক। সারা বছর ধরে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা মাটি, সেই মাটি দিয়েই মাকে স্নান করানো হয়। প্রকৃতির উপাদান দিয়েই প্রকৃতিস্বরূপা দেবীর আরাধনা—এই ভাবনাই তাঁদের পুজোর অন্যতম ভিত্তি। সমস্ত প্রচলিত নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয় পুজোর আচার। সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ, তার বাংলা ব্যাখ্যা এবং সংগীতের মেলবন্ধনে মণ্ডপে তৈরি হয় এক মোহময় পরিবেশ।

শালগ্রাম শিলা স্পর্শ করা নিয়েও নারীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। তবে এই ধারণার বিপরীতে নন্দিনী জানান, তাঁর বাবার পর তাঁর মা-ই শালগ্রাম শিলার নিত্যপুজো করেন এবং স্নান করান। ধর্মীয় আচারে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাকেই তিনি তুলে ধরেন।

শাস্ত্রীয় রীতির সঙ্গে সংগীত, সহজবোধ্য মন্ত্রপাঠ এবং সাম্যের দর্শনকে যুক্ত করে দুর্গাপুজোর এক স্বতন্ত্র উপস্থাপনা তৈরি করেছে শুভমস্তু। নারী পুরোহিতদের এই দল এখন যথেষ্ট ব্যস্ত। চলতি বছর চারটি দুর্গাপুজোর পৌরোহিত্যের দায়িত্ব রয়েছে তাদের কাঁধে। সেগুলি হল প্রশান্তি লেক গার্ডেন্স, জাহ্নবী, সেন্ট্রাল পার্ক যাদবপুর ও দেবীর বাড়ি পাটুলি। প্রচলিত আচারকে অক্ষুণ্ণ রেখেই নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করে চলেছে নন্দিনী ভৌমিকের শুভমস্তু।