ফের বাংলায় ফিরছেন আইপিএস অফিসার নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে নির্ধারিত সময়ের আগেই তাঁকে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানো হচ্ছে। ২০০৯ ব্যাচের এই আইপিএস অফিসার বর্তমানে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীতে ডিআইজি পদে ছিলেন। ভিলাই ইস্পাত কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি।
নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠির নাম অবশ্য বাংলার রাজনীতিতেও একসময় যথেষ্ট চর্চায় এসেছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে ভোটের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেই সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বচসার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটির পর তাঁর একটি মন্তব্য—‘উর্দিতে দাগ লাগতে দেব না’—ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল।
এর পর বীরভূমের পুলিশ সুপার পদেও দায়িত্ব সামলেছেন ত্রিপাঠি। ২০২৩ সালে বগটুই-কাণ্ড এবং তৃণমূলের তিন কর্মী খুনের ঘটনার পর তাঁকে পুলিশ ডিরেক্টরেটে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীতে ডেপুটেশনে যান তিনি।
ভিলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর অধীনেই প্রায় ৭০০ জন কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মী ছিলেন। এর মধ্যেই গত ২৬ মে দুর্গ জেলায় একটি বড়সড় লোহা চুরির ঘটনা সামনে আসে। আক্লোরদিহের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চুরি যাওয়া লোহার পাত ও বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তে উঠে আসে, ইস্পাত কারখানার লোহার পাত, বিম এবং বিভিন্ন পরিকাঠামোর অংশ কেটে ছোট করা হত। পরে সেগুলি ‘ফ্লু ডাস্ট’ বহনকারী গাড়ির আড়ালে পাচার করা হত বলে অভিযোগ। অভিযানে প্রায় ২৫০ টন লোহার পাত ও বিম উদ্ধার হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা। পাশাপাশি একাধিক ট্রাক, টিপার, বুলডোজার, হাইড্রা ক্রেন, চেন লিফটিং যন্ত্র এবং ধুলো তোলার যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর মোট মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকারও বেশি।
পুলিশের দাবি, প্রায় ছ’মাস ধরে এই চক্র সক্রিয় ছিল। ওই সময়ে তিন হাজার টনেরও বেশি ইস্পাত ও ভারী লোহা পাচার করা হয়ে থাকতে পারে। এর জেরে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত সংস্থার প্রায় ১৭ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
প্রথম দফায় এই ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ভিলাই ইস্পাত কারখানার এক জেনারেল ম্যানেজার হিমাংশুভূষণ মালিক এবং সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার মনোজকুমার দেওয়ানগনকেও আটক করা হয়। বর্তমানে এই মামলায় ১৫ জন জেলে রয়েছেন।
এত বড় চুরির ঘটনায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারীদের নজরে আসে কারখানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, পরিবহণকারী সংস্থা, ভাঙারি ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি স্তর। দুর্গের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুখনন্দন রাঠোর জানিয়েছিলেন, একটি সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে এই কারবার চলছিল। পরিবহণকারী, চালক, ভাঙারি ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগ থাকতে পারে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
এই ঘটনার পরই ত্রিপাঠিকে ভিলাই থেকে দিল্লিতে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সরকারি ভাবে এটিকে নিয়মিত বদলি হিসেবেই দেখানো হয়েছিল। তবে কোটি কোটি টাকার লোহা চুরির তদন্তের সঙ্গে তাঁর বদলির সময়কাল মিলে যাওয়ায় তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়।
এ বার সেই জল্পনার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ফেরার নির্দেশ পেলেন ত্রিপাঠি। গত ২৭ অগস্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে তাঁকে ডেপুটেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে তাঁর মূল ক্যাডার পশ্চিমবঙ্গে ফেরানো হচ্ছে। তাঁর জায়গায় ভিলাইয়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন ডিআইজি নির্ভীকার। ফলে নন্দীগ্রাম থেকে ভিলাই—বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অধ্যায় পেরিয়ে ফের রাজ্যেই ফিরছেন নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি।