অত্যন্ত জরুরি বিদেশ সফরে রয়েছেন, তবু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তীতে স্মৃতিতর্পণ করতে ভুললেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এক বিশেষ ভিডিও-বার্তায় তিনি দেশভাগ থেকে কাশ্মীর— শ্যামাপ্রসাদের এক বিস্তৃত রাজনৈতিক উপলব্ধি ও অবদানের কথা তুলে ধরেন। কলকাতার মিলমেলা প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে এদিন হাজির ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই বিশেষ ভিডিও বার্তা দেন।
মিলন মেলা
ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mookerjee) ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সোমবার কলকাতার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে (Milan Mela Prangan) স্মরণ অনুষ্ঠানে আচমকাই হাজির প্রধানমন্ত্রী। তবে সশরীররে নয়, ভিডিও বার্তায় তিনি জানালেন, কেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এক অমর নাম। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah), কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারা। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সম্মিলিত বন্দে মাতরম গানের মধ্য দিয়ে, তারপর মঞ্চস্থ হয় সুর সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র শীর্ষক এক বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রযোজনা, যেখানে সাতান্ন জন শিল্পী দেশের বিভিন্ন ধ্রুপদী, লোক ও ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতধারা তুলে ধরেন।
মোদীর বক্তব্যে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভিডিও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। এত সুন্দর ও ব্যাপক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন একটি দর্শন থেকে জনআন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পথ দেখিয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যে সময়ে ভারতীয় জনসঙ্ঘ (Bharatiya Jana Sangh) প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল, বিকল্প কোনও রাজনৈতিক দর্শনের জন্য পা রাখার জায়গাটুকুও পাওয়া কঠিন ছিল। মোদীর ভাষায়, ঠিক সেই পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নতুন দর্শনের সূচনা করার সাহস দেখিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এটি নিছক একটি সংগঠন বা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং গণতন্ত্রে দার্শনিক বহুত্ব, রাষ্ট্রীয় চেতনা এবং জনঅংশীদারিত্বের প্রতি তাঁর অটুট বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
বাংলা ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে মোদীর উদ্ধৃতি
বাংলা ভাগ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের ঐতিহাসিক অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, একসময় বাংলাকে সম্পূর্ণভাবে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চলেছিল, আর ঠিক তখনই শ্যামাপ্রসাদ দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, এক দেশে দুই বিধান, দুই নিশান চলবে না। জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu and Kashmir) প্রশ্নে তাঁর এই অবস্থানকেই মোদী জাতীয় সংহতির প্রতি আজীবন প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
রাজনীতির আঙিনায় বার্তা
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সশরীর উপস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব বক্তব্য মিলিয়ে এই অনুষ্ঠান স্রেফ শ্রদ্ধার্ঘ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক তাৎপর্যও বহন করছে। কংগ্রেসের তৎকালীন আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে জনসঙ্ঘ গঠনের প্রসঙ্গ টেনে মোদী পরোক্ষে আজকের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধেও একটি বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিকল্প দর্শন প্রতিষ্ঠার সাহসই বিজেপির ঐতিহাসিক ভিত্তি, এই আখ্যানকেই আরও একবার সামনে আনা হয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম এত বড় মাপে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ স্মরণ, যা দলের আদর্শগত শিকড়কে বাংলার সরকারি পরিসরে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার একটি ধারাবাহিক প্রয়াসেরই অংশ বলে ব্যাখ্যা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।