জ্ঞানবিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর আরাধনার পবিত্র লগ্নে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতার এক নীরব অথচ গভীর অর্থবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বেহালার শকুন্তলা পার্কের শুভায়ন পার্কস্থিত লোকরাম মিশন সেবা ও সংস্কৃতি মঞ্চ। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও বাবা লোকনাথকে সাক্ষী রেখে গত আট বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত এই সেবাযজ্ঞের অঙ্গ হিসেবে এ বছরও আয়োজন করা হল এক ব্যতিক্রমী মানবিক কর্মসূচি। সমাজের তথাকথিত ‘জীবন্ত সরস্বতী’দের প্রতি সম্মান জানিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ।
সরস্বতী পূজার পবিত্র দিনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কোনও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছিল না, ছিল না আড়ম্বরের বাহুল্য। কিন্তু আবেগ, কৃতজ্ঞতা আর মানবিকতার উষ্ণতায় তা হয়ে উঠেছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক সামাজিক উৎসব। সমাজের প্রায় একুশ জন ‘জীবন্ত সরস্বতী’র হাতে শীতবস্ত্র তুলে দেওয়া হয় লোকরাম মিশনের পক্ষ থেকে। এই ছোট্ট আয়োজনের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বড় একটি বার্তা। জ্ঞান, ত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাই একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষিকা, গায়িকা ও লেখিকা সঙ্গীতভারতী ডক্টর দীপশ্রী, শ্রাবন্তী কলাকেন্দ্রের অধ্যক্ষা ও নৃত্যগুরু শ্রাবনী রায়, সমাজকর্মী শ্যামল কর, অধ্যাপক নীলাভ রায়-সহ আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের উপস্থিতি ও আন্তরিক অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে শুধু একটি সামাজিক কর্মসূচির গণ্ডিতে আটকে রাখেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে জ্ঞান, মানবতা ও সহমর্মিতার এক অনাবিল মিলনক্ষেত্রে।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে আয়োজকেরা বলেন, ‘জীবন্ত সরস্বতী’রা সমাজের সেই মানুষ, যাঁরা নিঃশব্দে সমাজকে আলোকিত করে চলেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো মানে কেবল একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মানবিক মূল্যবোধের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। লোকরাম মিশনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, এই সেবাকর্ম কোনও একদিনের কর্মসূচি নয়, বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক যাত্রার অংশ, যেখানে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই আয়োজনকে ঘিরে ছিল উচ্ছ্বাস ও গর্বের অনুভূতি। অনেকেই বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ সমাজকে আরও মানবিক করে তোলে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতির বন্ধনকে শক্ত করে।
শুভায়ন পার্কের এই ছোট্ট পরিসরের অনুষ্ঠান তাই কেবল শীতবস্ত্র বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে এক মানবিক বার্তার প্রতীক— যেখানে দেবী সরস্বতীর আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে জীবন্ত মানুষদের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আদর্শ একসূত্রে মিলিত হয়েছে। লোকরাম মিশন সেবা ও সংস্কৃতি মঞ্চের এই উদ্যোগ সমাজের সামনে এক নীরব অথচ শক্তিশালী দৃষ্টান্ত রেখে গেল, যা ভবিষ্যতেও মানবিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।