একটি কিডনি, এক অনন্য মানবিকতার গল্প, এক ঐতিহাসিক রায়

File Photo

মানুষে মানুষে সম্পর্কের মূল্য শুধু সরকারি নথিতে মাপা যায় না। বিপদের দিনে যে পাশে দাঁড়ায়, সেই-ই প্রকৃত আপন—এই মানবিক বার্তাই তুলে ধরল কলকাতা হাই কোর্ট। শুক্রবার এক মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও পর্যবেক্ষণ করেন, এক জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায় কিডনি দান করতে চাওয়া এক অনাত্মীয় মহিলার পথে সরকারি বাধা সরিয়ে দিয়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সম্পর্কের প্রমাণ সব সময় কাগজে-কলমে থাকে না।

মামলার বয়ান অনুযায়ী, সুনীতা খাঁড়ার স্বামী চিন্টুর দু’টি কিডনিই কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনই তাঁর জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। পরিবারের কোনও নিকটাত্মীয় কিডনি দিতে রাজি না হওয়ায় এগিয়ে আসেন রূপা সাহা। তিনি জানান, অর্থের বিনিময়ে নয়, শুধুমাত্র এক অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচানোর মানবিক তাগিদ থেকেই তিনি কিডনি দান করতে চান।

কিন্তু দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে আত্মীয়তার নথিভিত্তিক প্রমাণ না থাকায় সরকারি অথরাইজ়েশন কমিটি অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। পরে মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও রূপা সাহার ভিডিও রেকর্ডিং খতিয়ে দেখে জানতে পারেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন রোগীর পরিবারের গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। সেই সূত্রেই দুই পরিবারের মধ্যে বহু বছরের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগও ছিল।


আদালতে রূপা আরও জানান, মানুষের জীবন বাঁচানোকে তিনি মানবিক ও ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করেন এবং সেই বিশ্বাস থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও পর্যবেক্ষণে বলেন, অথরাইজ়েশন কমিটির মূল দায়িত্ব হল কিডনি দান স্বেচ্ছায় হচ্ছে কি না এবং এর পিছনে কোনও আর্থিক লেনদেন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা। সম্পর্কের লিখিত নথি না থাকাকে ভিত্তি করে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার পথে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়।

হাই কোর্ট অথরাইজ়েশন কমিটির আগের সিদ্ধান্ত খারিজ করে এক সপ্তাহের মধ্যে আবেদনটি নতুন করে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। এই রায় শুধু একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের অনুমতির বিষয় নয়, মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর মূল্যবোধকে মর্যাদা দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।