শিল্পের টানে প্যারিস, কর্মজীবনে শান্তিনিকেতন, যোগেন চৌধুরীর বর্ণময় অধ্যায়

প্রয়াত আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম বিশিষ্ট শিল্পী যোগেন চৌধুরী। রবিবার সকালে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৭ বছর বয়সি এই শিল্পী। গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণও ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানলেন ভারতীয় চিত্রকলার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে শিল্পজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

দেশভাগের যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের অসহায়তা এবং শরীরের নানা বিকৃতিকে নিজের শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছিলেন যোগেন চৌধুরী। কালি, প্যাস্টেল ও জলরঙের ব্যবহারে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র চিত্রভাষা। তাঁর ছবিতে মানুষের ফোলা, বিকৃত কিংবা ভাঙাচোরা মুখও হয়ে উঠত গভীর মানবিক অনুভূতির প্রতীক। রেখার জটিল বুনন, শরীরী অবয়বের অস্বাভাবিক উপস্থাপনা এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল তাঁর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নারী, দম্পতি ও গণেশের মতো বিষয়ও বারবার ফিরে এসেছে তাঁর ছবিতে।

১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের জমিদার পরিবারের সদস্য। ছোটবেলা থেকেই আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কলকাতায় নিজেদের বাড়ির দেওয়ালে ময়ূরের ছবি আঁকার মধ্য দিয়েই তাঁর চিত্রচর্চার সূচনা বলে জানা যায়। সেই শৈশবের আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।


১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন যোগেন। এর পর উচ্চশিক্ষা ও শিল্পচর্চার জন্য পাড়ি দেন প্যারিসে। সেখানে ইকোল দে বো-আর্তস এবং উইলিয়াম হেটারের বিখ্যাত আতেলিয়ে সেভেনটিনে অঙ্কন ও ছাপচিত্রের চর্চা করেন। ইউরোপীয় শিল্পধারার সঙ্গে পরিচয় তাঁর শিল্পভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তবে তাঁর ছবির গভীরে থেকে গিয়েছিল বাংলার মাটি, দেশভাগের স্মৃতি এবং উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা। ইউরোপীয় শিল্পচর্চার প্রভাব ও বাংলার সামাজিক বাস্তবতার মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছিল তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পশৈলী।

প্যারিস থেকে দেশে ফেরার পর ক্রমশ সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে পরিচিতি বাড়ে যোগেন চৌধুরীর। সমাজ ও রাজনীতির নানা অসংগতি, ক্ষমতার কদর্যতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের টানাপড়েন উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে। ব্যঙ্গ ও বাস্তবতার মিশেলে তিনি মানুষের শরীরী অবয়বকে কেবল দৃশ্যমান রূপ হিসেবে দেখেননি, বরং তার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজের অন্তর্লীন যন্ত্রণা, বৈষম্য ও বৈপরীত্য। তাঁর শিল্পের অন্যতম শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় তুলে ধরার ক্ষমতা।

শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ছিলেন যোগেন। পরে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনা শুরু করেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের দায়িত্বও সামলেছেন। অবসরের পরেও কলাভবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন বিশ্বভারতীর সঙ্গে। তাঁর শিল্পকর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন পদ্মভূষণ-সহ একাধিক সম্মান। ললিতকলা একাডেমির স্বীকৃতির পাশাপাশি ফ্রান্সেও সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। সেই সম্পর্ক কেবল শিক্ষকতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জড়িয়ে ছিল তাঁর শিল্পভাবনা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গেও। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর কার্যকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নানা বিধিনিষেধ নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়েছিলেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ ছিল, বিশ্বভারতীতে আগের মতো খোলামেলা পরিবেশ আর নেই। নিজের হাতে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় তথা শান্তিনিকেতনের এমন পরিস্থিতি দেখলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হয়তো বিস্মিত হতেন বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন যোগেন। প্রথমবার শান্তিনিকেতন দেখার স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, “আমি ১৯৬৩ সালে প্রথম শান্তিনিকেতন দেখি, তখন এত প্রাচীর দেওয়া ছিল না।” তাঁর কথায়, “আমাদের সময়ে ছাত্র, অধ্যাপক ও উপাচার্য, সকলের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকত। উপাচার্যকে আমরা দাদা বলতাম। এখন সেই পরিবেশ আর নেই!” তাঁর এই মন্তব্যে ধরা পড়েছিল শান্তিনিকেতনের অতীতের মুক্ত পরিবেশের প্রতি গভীর টান এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা।

২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। শিল্পের পাশাপাশি রাজনীতির আঙিনাতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে রাজনৈতিক পরিচয় কখনও তাঁর শিল্পীসত্তাকে ছাপিয়ে যায়নি। জনজীবন ও রাজনীতির নানা অভিজ্ঞতা তাঁর ভাবনাকে সমৃদ্ধ করলেও ক্যানভাসই ছিল তাঁর নিজস্ব জগৎ, নিজের বক্তব্য প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।

যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শুধু একজন শিল্পীর জীবনাবসান হল না, ভারতীয় চিত্রকলার এক স্বতন্ত্র অধ্যায়েরও অবসান ঘটল। রেখা, রং ও অবয়বের মাধ্যমে যিনি দেশভাগের ক্ষত, মানুষের অসহায়তা এবং সমাজের নানা বৈপরীত্যকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর কাজ আগামী দিনেও শিল্পপ্রেমী ও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।