ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারিতে চন্দননগরে জগদ্ধাত্রীপুজোর কেন্দ্রীয় কমিটিকে ঘিরে নতুন চর্চা

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে অতীতেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। ২০১৮ সালে প্রথম এই উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। মাঝে কয়েক বছর বিষয়টি তেমন সামনে না এলেও, ২০২৫ সালে ফের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এবার দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় তাঁর গ্রেফতারির পর চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজোকে ঘিরে সেই পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।

২০১৬ সালে চন্দননগর কেন্দ্র থেকে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন ইন্দ্রনীল সেন। পরবর্তী সময়ে এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ে। অভিযোগ, ২০১৮ সালে তিনি জগদ্ধাত্রীপুজোর কেন্দ্রীয় কমিটির কাজে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন। ভদ্রেশ্বর থেকে চন্দননগর পর্যন্ত পুজো কমিটিগুলির সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে এই কেন্দ্রীয় কমিটি।

কার্নিভাল নিয়ে আপত্তি কেন্দ্রীয় কমিটির

অভিযোগ অনুযায়ী, কলকাতার রেড রোডে দুর্গাপুজোর কার্নিভালের আদলে চন্দননগরেও কার্নিভাল আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল ইন্দ্রনীলের। কিন্তু চন্দননগরের ঐতিহ্য বজায় রাখার পক্ষে ছিল কেন্দ্রীয় কমিটি। তাদের অবস্থান ছিল, কার্নিভালের পরিবর্তে প্রচলিত শোভাযাত্রাই হবে। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তেই অনড় থাকে কমিটি।


২০২৫ সালে ফের এই বিষয়টি নিয়ে সংঘাত তৈরি হয় বলে দাবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের। সেই সময় তৃণমূলের অন্দরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। ইন্দ্রনীলের উদ্যোগের বিরোধিতায় সামনে এসেছিলেন চন্দননগরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অশোক সাউয়ের ছেলে শুভজিৎ সাউ।

ইন্দ্রনীল গ্রেফতার হওয়ার পর অবশ্য এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চাননি শুভজিৎ। তিনি জানান, যা বলার কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান নিমাইচন্দ্র দাস বলবেন।

নিমাইচন্দ্র দাসের বক্তব্য, “উনি যে ভাবে কার্নিভাল করতে চেয়েছিলেন, তা মেনে নেয়নি কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে থাকা ১৮০টি বারোয়ারি। আমরা আমাদের ঐতিহ্য রাখতে চেয়েছিলাম। তা করতে পেরেছি। তাতেই ওঁর রাগ!”

পুজো কমিটির সদস্যদের দাবি, ঐতিহ্য রক্ষা হয়েছে

এত দিন চন্দননগরের একাংশের ধারণা ছিল, রেড রোডের আদলে কার্নিভাল আয়োজনের উদ্যোগের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কিন্তু পুজোর পাস বিক্রি সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারির পর কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন সংগঠক তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এখন তো বোঝা যাচ্ছে কী কারণে বিধায়কের এত উৎসাহ ছিল। সুযোগ পেলে এখানেও তছরুপ করতেন। কিন্তু তা রুখে দেওয়া গিয়েছে। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজোর গায়ে কোনও দাগ লাগেনি।”

তবে এই বক্তব্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের অভিযোগ ও তাঁদের নিজস্ব ব্যাখ্যা। জগদ্ধাত্রীপুজোর আয়োজন ঘিরে দুর্নীতির কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আলাদা বিষয়।

অতীতের বিধায়কদের সঙ্গে তুলনা

কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন প্রবীণ সংগঠকের দাবি, চন্দননগরে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিধায়ক থাকলেও কেউ জগদ্ধাত্রীপুজোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেননি। তাঁদের উদাহরণ হিসেবে সিপিএমের সন্ধ্যা চট্টোপাধ্যায় ও রতন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের কমল মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

সংগঠকদের আরও দাবি, গত এক দশকে পুজোর সময় শহরের বিভিন্ন জায়গায় কোনও বিধায়কের এত বেশি ছবি আগে দেখা যায়নি। তাঁদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই প্রবণতা বেড়েছে।

পুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে, পুলিশি হেফাজতে ইন্দ্রনীল

এদিকে চন্দননগরে জগদ্ধাত্রীপুজোর প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। তেমাথার সর্বোচ্চ প্রতিমার কাঠামোয় মাটি লাগানোর কাজও শুরু হয়েছে। শহরজুড়ে উৎসবের প্রস্তুতির মধ্যেই দুর্নীতি মামলায় পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর পুলিশি হেফাজত চলবে। ফলে জগদ্ধাত্রীপুজোর আবহেই তাঁকে ফের আদালতে পেশ করা হবে।

ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারির পর চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজোর কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে তাঁর অতীতের সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে।