তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় ইডির ক্ষমতা নিয়ে সরগরম হাইকোর্ট

Photo: File photo

তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ সংক্রান্ত মামলায় সোমবার কলকাতা হাই কোর্টে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সরগরম হয়ে ওঠে শুনানি। আবেদনকারীদের মামলা করার অধিকার, দলের অথরাইজেশন, সিভিল কোর্টের নির্দেশ, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এবং ইডির পদক্ষেপ—সবকিছু নিয়েই দীর্ঘ আইনি বিতর্ক হয়।

কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষে অভিষেক মনু সিংভি দাবি করেন, দলের সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অথরাইজেশন রয়েছে। এর জবাবে ইডির পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এস ভি রাজু বলেন, এই অথরাইজেশনের কোনও বৈধতা নেই। তাঁর দাবি, ৭ জুলাইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী জমা দেওয়া নথি আনডেটেড এবং বর্তমান কমিটি এমন কোনও অনুমোদন দেয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটির কোনও অনুমোদন নেই, ডেরেক ও’ব্রায়েনও এমন কোনও অথরাইজেশন দেননি। ফলে আবেদনকারীদের দলের হয়ে মামলা করার বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কোন আইনি অধিকার নেই।’

এসভি রাজুর আরও অভিযোগ, ৭ জুলাই সিভিল কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ১০ জুলাই এই মামলা করা হয়েছে, যা আদালতের নির্দেশের অবমাননার সামিল। তাই মামলার গ্রহণযোগ্যতা আগে বিচার করা উচিত। এর জবাবে সিংভি বলেন, ৭ জুলাইয়ের নির্দেশটি ছিল একতরফা যেখানে তাঁদের কোনও নোটিশ বা বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, ৯ জুলাই বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্যের একক বেঞ্চ যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেটিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। অথচ কোনও স্বীকৃতি ছাড়াই সেই নির্দেশের বিরোধিতা করা হচ্ছে।


সিংভি আদালতে বলেন, ‘বর্তমানে “ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার” চলছে এবং পুলিশ ও ইডি একসঙ্গে কাজ করছে।’ তাঁর অভিযোগ, একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা থাকলেও পুলিশ ও ইডি কীভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ১৮ জুন অভিযোগ দায়ের হলেও আদালতের নির্দেশ ছিল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ করা যাবে না। সেই পরিস্থিতিতে ইডি কীভাবে ৭ জুলাই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানতে চান, মোট কতগুলি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। সিংভি জানান, তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।
শুনানির সময় বিচারপতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘কোনও গোষ্ঠীর বক্তব্য শুনে সিভিল কোর্ট কীভাবে স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এটি নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার।’ তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে সিভিল কোর্ট সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী থাকবে? সংবিধানের দশম তফসিলের আওতাধীন বিষয়ে সিভিল কোর্টের এক্তিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আদালত।

ঋতব্রত তৃণমূলের আইনজীবী জিষ্ণু বসু আদালতে জানান, বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে। এদিকে তৃণমূলের আরেক আইনজীবী কিশোর দত্ত প্রশ্ন তোলেন, ‘তদন্ত চলাকালীন ইডি কীভাবে প্রেস রিলিজ দিতে পারে?’ তাঁর দাবি, ১৬০ কোটি টাকার বেআইনি লেনদেনের অভিযোগ করা হলেও ইসিআইআর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের নির্দেশ সবই স্বেচ্ছাচারী। তিনি বলেন, ‘একক বেঞ্চ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে পুলিশের কাছে এমন কোনও উপাদান নেই। ইডি কোনও পুলিশ সংস্থা নয় এবং ২০০২ সালের আইনের আওতায় পদক্ষেপেরও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।’

বিচারপতি রাও তখন জানতে চান , তদন্ত চলাকালীন এবং ফ্রিজিং অর্ডার জারি হয়ে যাওয়ার পরে এই পর্যায়ে আদালতের হস্তক্ষেপ আদৌ প্রয়োজনীয় কি না। কিশোর দত্ত জানান, দলের বিভিন্ন প্রশাসনিক খরচ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে এস ভি রাজু বলেন, ‘একক বেঞ্চের নির্দেশে পুলিশ সিজ করতে পারবে না, এমন পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই সেই নির্দেশের উপর নির্ভর করা যায় না।’ তাঁর দাবি, পুলিশের তথ্য ও বয়ান অনুযায়ী প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা অন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রয়েছে, যা এখনও পরিচালিত হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করলে টাকা দুবাই বা অন্য দেশে সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইডির অপর আইনজীবী এডিশনাল সলিসিটার জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী বলেন, ‘পুলিশ তথ্য না দিলেও অন্য সূত্রে কোনও তথ্য পেলে ইডি তদন্ত শুরু করতে পারে।’ তবে বিচারপতি জানান, যথাযথ নোটিশ ছাড়া তাঁকে এই মামলায় যুক্ত করা হবে না। মামলার শুনানি শেষে আদালত জানায়, তদন্ত চলবে এবং ইডি অ্যাডজুডিকেটিং অথরিটির কাছে রিপোর্ট দাখিল করবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।