এলাহাবাদ হাই কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা! ‘দৃষ্টান্ত স্থাপনের’ নামে এনএসএ, জ্ঞানেশ-কন্যার সিদ্ধান্তকে ‘উপহাসের যোগ্য’ বলল আদালত

দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা তথা উত্তরপ্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলাশাসক মেধা রূপমের ভূমিকা নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুলল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় বঙ্গতনয়া আকৃতি চৌধুরীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেধাই। সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই এবার আদালতের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হল তাঁকে।

চলতি বছরে নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের সময় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আকৃতিকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়। এরপর টানা পাঁচ মাস বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকতে হয় তাঁকে। গত ২ সেপ্টেম্বর আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ বাতিল করে দেয় এলাহাবাদ হাই কোর্ট। সোমবার প্রকাশ্যে এসেছে সেই রায়ের প্রতিলিপি। আর তাতেই মেধা রূপমের সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে একের পর এক কঠোর পর্যবেক্ষণ করেছে বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইন প্রয়োগের পিছনে মেধার উদ্দেশ্য ছিল ‘দৃষ্টান্ত স্থাপন’ করা। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তকে আদালত কার্যত ‘উপহাসের যোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে। বিচারপতিদের মতে, মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে জেলাশাসক তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্বই লঙ্ঘন করেছেন।


শুধু আইনি পদক্ষেপ বাতিল করেই থামেনি আদালত। আকৃতিকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ওই ক্ষতিপূরণের অর্থ মেধা রূপম এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আধিকারিকদের বেতন থেকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ অবশ্য প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আদালতের কড়া বার্তা। বিচারপতিদের স্পষ্ট বক্তব্য, পুলিশ এবং আমলাদের মনে রাখতে হবে—তাঁদের আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, কোনও রাজনৈতিক প্রশাসনের প্রতি নয়। তাঁদের এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয়, যাতে তাঁরা ‘ব্রিটিশ আমলের দমন-পীড়নের বাহক’-এর মতো হয়ে ওঠেন।

এখানেই শেষ নয়। জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ১৯৮৪’-এর প্রসঙ্গ টেনে উত্তরপ্রদেশের আমলাতন্ত্রকে কার্যত সতর্ক করেছে আদালত। বিচারপতিদের বক্তব্য, প্রশাসন নিজেদের আচরণ সংশোধন না করলে অদূর ভবিষ্যতে উত্তরপ্রদেশ ‘সম্পূর্ণ জীবনগ্রাসী রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার দিকে এগোতে পারে।

১৯৪৯ সালে প্রকাশিত অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে এমন এক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের ছবি উঠে এসেছিল, যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তাভাবনা এমনকি ইতিহাসের উপরও বিস্তৃত। সেই উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ যে উত্তরপ্রদেশের প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা, তা বলাই বাহুল্য।