আইএএস-আইপিএস রদবদল ও অবজার্ভার পাঠিয়ে কড়া বার্তা কমিশনের

প্রতীকী চিত্র

আসন্ন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-কে সামনে রেখে প্রশাসনিক স্তরে নজিরবিহীন সক্রিয়তা দেখাল নির্বাচন কমিশন। ভোট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রভাবমুক্ত রাখতে ধারাবাহিকভাবে একাধিক বড়সড় রদবদল, বদলি এবং পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইএএস থেকে আইপিএস—প্রশাসনের প্রায় সব স্তরেই এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের শীর্ষ আমলাদের একাংশকে ভিনরাজ্যে অবজার্ভার হিসেবেও পাঠানো হয়েছে, যা এই নির্বাচনী প্রস্তুতির গুরুত্বকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

প্রথম ধাপেই কমিশন নজর দেয় জেলা প্রশাসনের উপর। ১৮ মার্চ জারি হওয়া নির্দেশিকায় জানানো হয়, নির্বাচনী প্রস্তুতি খতিয়ে দেখে রাজ্যের একাধিক জেলায় জেলা শাসক (ডিএম) তথা জেলা নির্বাচন আধিকারিক (ডিইও) পদে নতুন নিয়োগ করা হচ্ছে। মোট ১৩ জন আইএএস আধিকারিককে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হয়েছে। কমিশনের মতে, জেলা প্রশাসনই নির্বাচনের মূল স্তম্ভ, ফলে এখানে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোচবিহারে জিতিন যাদব, জলপাইগুড়িতে সন্দীপ ঘোষ, উত্তর দিনাজপুরে বিবেক কুমার এবং মালদায় রাজনবীর সিং কাপুরকে ডিএম-কাম-ডিইও হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি মুর্শিদাবাদে আর অর্জুন, নদিয়ায় শ্রীকান্ত পাল্লি এবং পূর্ব বর্ধমানে স্বেতা আগরওয়াল নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। দার্জিলিংয়ে হরিশঙ্কর পানিকার এবং আলিপুরদুয়ারে টি বালাসুব্রমানিয়ানকে একইভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু জেলা স্তরেই নয়, মহানগর কলকাতা-তেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। কলকাতা পুরসভার মিউনিসিপ্যাল কমিশনার স্মিতা পান্ডেকে কলকাতা উত্তরের ডিইও করা হয়েছে, আর রণধীর কুমারকে কলকাতা দক্ষিণের ডিইও হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় শিলপা গৌরিসারিয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অভিষেক কুমার তিওয়ারিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই সমস্ত নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে এবং ১৯ মার্চ দুপুর ৩টার মধ্যে নতুন পদে যোগদানের রিপোর্ট পাঠাতে হবে।
একই সঙ্গে কমিশন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করে—যাঁদের বদলি করা হয়েছে, তাঁদের নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও দায়িত্বে রাখা যাবে না। অর্থাৎ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ এড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন।
এরপরেই আসে পুলিশ প্রশাসনে বড়সড় রদবদল। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কমিশনের নির্দেশ মেনে একাধিক শীর্ষ আইপিএস আধিকারিককে নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য পদে পাঠানো হয়েছে। এতদিন দক্ষিণবঙ্গের এডিজি ও আইজি পদে থাকা রাজীব মিশ্রকে এডিজি (মডার্নাইজেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন) পদে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রবীন কুমার ত্রিপাঠী এবং সুনীল কুমার চৌধুরীকে এসটিএফ-এর আইজি করা হয়েছে। সুকেশ কুমার জৈনকে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের আইজি পদে নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি আকাশ মাঘারিয়া এবং ড. কোটেশ্বর রাওকে একই শাখায় ডিআইজি করা হয়েছে।
তবে লক্ষ্মী নারায়ণ মীণা সংশোধনাগার পরিষেবার এডিজি ও আইজি পদে বহাল থাকছেন, এবং অতিরিক্তভাবে এসসিআরবি-র দায়িত্বও সামলাবেন। এই আংশিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
জেলা স্তরেও একাধিক পুলিশ সুপারকে সরিয়ে বিভিন্ন শাখায় পাঠানো হয়েছে। জবি থমাস কে, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, পারিজাত বিশ্বাস, প্রিয়ব্রত রায়, অমনদীপ, কামনাশিস সেন, বিশ্বপ সরকার, ধৃতিমান সরকার, সন্দীপ কারা, আরিশ বিলাল, হোসেন মেহেদি রহমান এবং পলাশ চন্দ্র ঢালির মতো আধিকারিকদের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ, এসটিএফ ও সিআইডি-সহ বিভিন্ন দপ্তরে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে’ এই বদলিগুলি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
পুলিশ প্রশাসনের এই পুনর্বিন্যাসের পরেই আরও এক ধাপ এগিয়ে কমিশন পাঁচজন আইপিএস আধিকারিককে ডিআইজি পদে বদলির নির্দেশ দেয়। নির্দেশিকা অনুযায়ী, রথোড় অমিতকুমার ভারতকে রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি, অজিত সিং যাদবকে মুর্শিদাবাদে, শ্রীহরি পাণ্ডেকে বর্ধমানে, কঙ্কর প্রসাদ বারুইকে প্রেসিডেন্সি রেঞ্জে এবং অঞ্জলি সিংহকে জলপাইগুড়ির ডিআইজি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এখানেও একই নির্দেশ—১৯ মার্চ সকাল ১১টার মধ্যে যোগদানের রিপোর্ট জমা দিতে হবে এবং বদলিকৃত আধিকারিকদের আর কোনও নির্বাচনী দায়িত্বে রাখা যাবে না।
এই ধারাবাহিক রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উঠে এসেছে রাজ্যের শীর্ষ আমলাদের একাংশকে ভিনরাজ্যে অবজার্ভার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিপর্যয় মোকাবিলা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের সিনিয়র বিশেষ সচিব প্রিয়াঙ্কা শিঙ্গলা এবং শিল্প, বাণিজ্য ও উদ্যোগ দপ্তরের সচিব তথা পশ্চিমবঙ্গ খনিজ উন্নয়ন ও বাণিজ্য কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান-সহ ম্যানেজিং ডিরেক্টর পি মোহন গান্ধীকে অবজার্ভার হিসেবে অন্য রাজ্যে পাঠানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রথম তালিকায় তাঁদের নাম না থাকলেও পরে সংশোধিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে পূর্ত দপ্তরের সচিব অন্তরা আচার্য এবং খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তরের প্রধান সচিব পারভেজ আহমেদ সিদ্দিকিকেও একইভাবে পাঠানো হয়েছিল। এমনকি অপসারিত স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকেও ভোট-পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত কমিশনের কড়া অবস্থানেরই ইঙ্গিত বহন করে। কারণ সাধারণত অবজার্ভাররা সংশ্লিষ্ট রাজ্যে গিয়ে সরাসরি ভোট প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি চালান এবং কমিশনকে রিপোর্ট দেন। ফলে এই নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।
প্রসঙ্গত, ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যে জারি হয়েছে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের একাধিক স্তরে ধারাবাহিক পরিবর্তনকে নির্বাচন কমিশনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, অতীতেও ভোটের আগে এই ধরনের রদবদল হয়েছে, তবে এবারের পদক্ষেপের ব্যাপকতা এবং গতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একাংশ এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলছে, এর ফলে ভোট প্রক্রিয়া আরও নিরপেক্ষ হবে। অন্যদিকে, বিরোধীদের একাংশের দাবি, এত বড়সড় প্রশাসনিক পরিবর্তন ভোটের সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
তবে সব মিলিয়ে স্পষ্ট, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয় নির্বাচন কমিশন। প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিটি স্তরে পুনর্বিন্যাস করে তারা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—নির্বাচন যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই কড়া পদক্ষেপ। আগামী দিনে এই পরিবর্তনের প্রভাব ভোটের ময়দানে কতটা পড়ে, এখন সেটাই দেখার।