যে মাটি ছাড়া দুর্গাপ্রতিমা হয় না, সেই মাটির মানুষগুলিই কেন পুজোয় ব্রাত্য?

AI

মা আসছেন ঘরে। তাই সাজছে বাড়ি। দেওয়ালে পড়ছে নতুন রঙের প্রলেপ। ঠাকুরদালান জুড়ে আঁকা হচ্ছে আলপনা। বাড়ির বউ-মেয়েরা নানা রঙে ফুটিয়ে তুলছেন নকশা।

ব্যস্ত বাড়ির জ্যাঠা-কাকারাও। আর ঠাকুরদালানের এক কোণে ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে উঠছেন উমা। মৃৎশিল্পীর হাতে মাটির শরীরে প্রাণ পাচ্ছেন মহিষাসুরমর্দিনী।

কিন্তু সেই মাটির সবটাই কি পবিত্র বলে সমাজ মেনে নেয়?
না। সেই মাটিরই একটি অংশ আসে এমন এক এলাকা থেকে, যাঁদের সারা বছর সমাজের একটা বড় অংশ ‘অশুচি’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে। পতিতাপল্লির দরজার বাইরের মাটি।


যাঁদের শরীর, পেশা, জীবনযাপন নিয়ে সমাজের বিচার শেষ হয় না, তাঁদের ঘরের বাইরের মাটিই আবার শাস্ত্রমতে দেবীর মৃন্ময়ী রূপ গড়ার অন্যতম উপকরণ।

এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে। যে এলাকার মাটি ছাড়া কোথাও কোথাও দেবীর প্রতিমা সম্পূর্ণ হয় না, সেই এলাকার নারীদেরই কি সমাজ সম্মান দিতে পারে না?

এক দিনের জন্য তাঁদের মাটিকে পবিত্র বলে গ্রহণ করা হয়, অথচ বছরের বাকি দিনগুলিতে তাঁদের জীবন, অস্তিত্ব এবং অধিকার নিয়ে কেন এত ছুঁৎমার্গ?

“একদিন মাটি নেওয়ার সময় তাঁদের সম্মান, অথচ সারা বছর তাঁদের অসম্মান”—এই প্রশ্নটাই সামনে আনছেন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির প্রাক্তন সচিব স্বপ্না গায়েন।

দুর্গাপ্রতিমা তৈরির প্রাচীন রীতিতে একাধিক জায়গার মাটি ব্যবহারের কথা বলা হয়। রাজবাড়ির মাটি, গঙ্গার দুই তীরের মাটি, গাভীর মূত্র ও গোবর, ধানের শিস, গঙ্গাজল—এর সঙ্গে রয়েছে তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ’ এলাকার মাটি। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, যৌনকর্মীদের ঘরের দরজার বাইরের অংশ থেকে মাটি সংগ্রহ করার কথা বলা হয়।
কেন?

এই রীতির ব্যাখ্যাও একাধিক। একটি মত অনুযায়ী, প্রাচীনকালে ‘বেশ্যা’ শব্দটির সঙ্গে বণিক বা বৈশ্য সম্প্রদায়ের যোগ ছিল। সেই অর্থে ‘বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা’ বলতে বণিক পরিবারের দরজার মাটিকেও বোঝানো হয়ে থাকতে পারে।

পরবর্তী সময়ে শব্দের অর্থ বদলাতে বদলাতে সেই মাটি যৌনকর্মীদের ঘরের দরজার বাইরের মাটি হিসেবে প্রচলিত হয়েছে—এমন মতও রয়েছে।

আর একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্বাস করা হয়, এক জন পুরুষ যৌনকর্মীর ঘরে প্রবেশ করার সময় তাঁর জীবনের সঞ্চিত পুণ্য দরজার বাইরে ফেলে যান। ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে তিনি নিয়ে আসেন পাপ। ফলে সেই দরজার বাইরের মাটি হয়ে ওঠে পুণ্যে পরিপূর্ণ।

অর্থাৎ, যে নারীদের সমাজ ‘অপবিত্র’ বলে চিহ্নিত করে, তাঁদের জীবনযন্ত্রণার মধ্যেই পবিত্রতার এক অন্য ব্যাখ্যা খুঁজে নেয় এই প্রাচীন রীতি।

আর এখানেই উঠে আসে আরও বড় প্রশ্ন—নারীকে ‘পতিতা’ বানায় কে?
সমাজের চাহিদা, পুরুষের কামনা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা—সব মিলিয়ে যে পেশার জন্ম, সেই পেশায় থাকা নারীকেই আবার সমাজ ‘নষ্ট’ বলে দাগিয়ে দেয়। তাঁদের কাছেই যায় পুরুষ। অথচ তাঁদের কাছেই সমাজের নৈতিকতার সবচেয়ে কঠিন বিচার।

মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি গড়ার মাটিতে সেই বৈপরীত্যই যেন মিশে থাকে।

এই প্রতিবাদের ইতিহাস শুধু পুজোর মাটি ঘিরে নয়। সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বারবার নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন যৌনকর্মীরা।

আরজিকরের চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভয়াবহ সেই ঘটনার প্রতিবাদে যৌনকর্মীরা দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্য মাটি দিতে অস্বীকার করেছিলেন।

তাঁদের সেই অবস্থান ছিল প্রতিবাদেরই এক প্রতীকী ভাষা—যে সমাজে এক তরুণী চিকিৎসক নিরাপদ নন, সেই সমাজের উৎসবেও তাঁদের নীরব থাকার প্রশ্ন নেই।

মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায়, ‘আমরা পদাতিক’-এর অ্যাডভোকেসি অফিসার, প্রশ্ন তুলছেন সেই জায়গাতেই।

তাঁর বক্তব্য, দুর্গাপুজো যদি সত্যিই সকলের উৎসব হয়, তবে পুজোমণ্ডপে প্রবেশ থেকে শুরু করে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ গ্রহণ, এমনকি বিসর্জনের সিঁদুরখেলা—সব ক্ষেত্রেই যৌনকর্মীদের সমান অধিকার থাকা উচিত। বাস্তবে কি সেই অধিকার তাঁরা পান?

শুধু মণ্ডপে প্রবেশ নয়, প্রতিমার মাটির ক্ষেত্রেও বদলে গিয়েছে এক সময়ের রীতি।

দীর্ঘ আন্দোলনের পরে যখন যৌনকর্মীরা নিজেরাই দুর্গাপুজোয় অংশ নেওয়ার অধিকার আদায় করতে শুরু করেন, তখন তাঁদের এলাকা থেকে সরাসরি মাটি সংগ্রহের পরিবর্তে অন্য ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই দশকর্মা ভাণ্ডারে সেই মাটি পৌঁছয়। সেখান থেকে মৃৎশিল্পীরা তা সংগ্রহ করেন।
কেন এই পরিবর্তন? প্রশ্ন থেকেই যায়।

২০০০ সালে যৌনকর্মীরা এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—এক দিনের জন্য সম্মান দেখিয়ে সারা বছরের অসম্মানকে বৈধতা দেওয়া যায় না।

তারও পরে আন্দোলন থামেনি।

দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির প্রাক্তন সচিব ভারতী দে জানান, ২০১৩ সালে দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতি সোনাগাছিতে দুর্গাপুজো শুরু করে। পুজোর অনুমতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে ঘরের ভিতরে পুজোর ব্যবস্থা হয়। এই সময় যৌন কর্মীদের করা মামলায় সাহায্য করেছিলেন আইনজীবী অরুণাভ ঘোষ।

পরবর্তী সময়ে পুজো বন্ধ হয়ে গেলেও ফের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে বাইরে দুর্গাপুজোর অনুমতি চায় দুর্বার। অনুমতি মেলে। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় শুরু হয় পুজো। সেই থেকে আজও সেখানে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে।

আমরা পদাতিক – এর সচিব শতাব্দী সাহা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই দীর্ঘ পথচলায় যৌনকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের মতো করে পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ হোক বা ‘আমরা পদাতিক’—উদ্দেশ্যের জায়গায় রয়েছে একই বৃহত্তর প্রশ্ন: পুজো যদি সকলের হয়, তবে সেই পুজোয় যৌনকর্মীদের অধিকারও স্বাভাবিক এবং সমান হওয়া উচিত। তাহলে কেনো দূর্বারের পুজোতে আমরা পদাতিক এর সদস্যরা যেতে পারেন না?’

আসলে মাটির গল্পটা শুধু মাটির গল্প নয়। এটা সম্মানের গল্প। অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্প। সমাজের দ্বিচারিতার গল্প।
প্রতিবছর রথের সময় থেকে কুমোরপাড়ায় শুরু হয় দেবী গড়ার ব্যস্ততা। খড় বাঁধা হয়, কাঠামো তৈরি হয়, মাটি পড়ে। কমেটে, দোমেটে পেরিয়ে ধীরে ধীরে পূর্ণ অবয়ব পান মহিষাসুরমর্দিনী। তারপর রং, সাজ, অলংকার। কয়েক মাসের পরিশ্রম শেষে তিনি আসেন মণ্ডপে, বাড়ির ঠাকুরদালানে।