‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এ লুধিয়ানার শিল্পপতির ৭ কোটি প্রতারণা, কলকাতা থেকে গ্রেফতার মূল অভিযুক্ত

ছবি: এএনআই

‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে ফেলে লুধিয়ানার পদ্মভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত শিল্পপতি এসপি ওসওয়ালের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগ। সেই মামলায় কলকাতা থেকে সোহেল আখতার ওরফে রাজুকে গ্রেফতার করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ২৮ সেপ্টেম্বর অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তরফে বৃহস্পতিবার জানানো হয়েছে, কলকাতার বিশেষ আদালত থেকে ট্রানজিট রিমান্ড পাওয়ার পর সোহেলকে জলন্ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিশেষ আদালত তাঁকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ইডি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতারণার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা এবং টাকা লেনদেনের সূত্র খতিয়ে দেখতেই তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অভিযোগ, ২০২৩ সালের অগস্টে লুধিয়ানার বর্ধমান গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান এসপি ওসওয়ালকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করা হয়। অভিযুক্তরা নিজেদের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক বলে পরিচয় দিয়ে তাঁকে ভয় দেখিয়েছিল বলে অভিযোগ। এরপর তাঁর কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।


লুধিয়ানা সাইবার অপরাধ থানায় দায়ের হওয়া এফআইআরের ভিত্তিতে এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করে ইডি। একই চক্রের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মাধ্যমে সাইবার প্রতারণার আরও ন’টি এফআইআরও তদন্তের আওতায় আনা হয়।

ইডির দাবি, প্রতারণার টাকা প্রথমে রিগলো ভেঞ্চার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং ফ্রোজ়েনম্যান ওয়্যারহাউসিং অ্যান্ড লজিস্টিক্সের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, রুমি কালিতা এবং অর্পিত রাঠোর ওই সংস্থার অ্যাকাউন্টগুলি নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ।

তদন্তকারীদের দাবি, প্রতারণার টাকা দ্রুত বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাতে ‘এএমএমফরওয়ার্ড’ নামে একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ব্যবহার করা হত। অর্পিত রাঠোর বিদেশে থাকা সহযোগীদের কাছে বিভিন্ন ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য সরবরাহ করতেন বলেও অভিযোগ। বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে তাঁর অ্যাকাউন্টে কমিশন জমা পড়ত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই রুমি ও অর্পিতকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের পরেই সোহেলের নাম সামনে আসে বলে ইডি সূত্রের দাবি।

ইডির আরও অভিযোগ, রিগলো ভেঞ্চার্সের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করতেন সোহেল। চক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নথি ব্যবহার করে ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তার জন্য লোক নিয়োগ করা।

তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, একাধিক মোবাইল ফোনে বিশেষ অ্যান্ড্রয়েড ফাইল আগে থেকেই ইনস্টল করে রাখা হত। ওই ফোনে বিভিন্ন সংস্থার নামে খোলা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত সিমকার্ড ব্যবহার করা হত। পরে সেই অ্যান্ড্রয়েড ফাইল সক্রিয় করে নেপালে থাকা সহযোগীদের ওই ফোনে আসা ওটিপি এবং অন্যান্য বার্তা দেখার সুযোগ করে দেওয়া হত। এর মাধ্যমে দ্রুত টাকা সরানো হত বলে ইডির দাবি।

তদন্তকারীদের দাবি, প্রতারণার টাকা ২ থেকে ৫ লক্ষ টাকা করে বিভিন্ন ভুয়ো অ্যাকাউন্টে পাঠানো হত। পরে দ্রুত নগদে সেই টাকা তুলে নেওয়া হত। আর্থিক ভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের চাকরি বা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের নথি ব্যবহার করে ওই অ্যাকাউন্টগুলি খোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

বিদেশে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানের জন্য সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড ব্যক্তিগত বার্তা আদানপ্রদানের অ্যাপও ব্যবহার করা হত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এই মামলায় এর আগে প্রায় ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকার সম্পত্তি অস্থায়ী ভাবে বাজেয়াপ্ত করেছিল ইডি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রুমি কালিতা, অর্পিত রাঠোর, আনন্দ চৌধুরী, অতনু চৌধুরী এবং ফ্রোজ়েনম্যান ওয়্যারহাউসিং অ্যান্ড লজিস্টিক্সের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও জমা দেওয়া হয়।

সোহেল আখতারকে গ্রেফতারের পর এই প্রতারণা চক্রের আর্থিক লেনদেন, বিদেশি যোগাযোগ এবং ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ কাণ্ডে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।