সরকার বদলের পর ‘অ্যাকশন মোডে’ মন্ত্রিসভা, শিল্প থেকে খেলাধুলায় একাধিক সিদ্ধান্ত

CM Suvendu Adhikari Photo-SNS

সরকার বদলের পরে প্রশাসনিক কাজকর্মে গতি আনার বার্তা আগেই দিয়েছিল নতুন রাজ্য সরকার। সেই আবহেই অষ্টম মন্ত্রিসভা বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। চা-বাগানের জমি থেকে শিল্প পার্ক, পরিবেশ সংরক্ষণ থেকে আইনশৃঙ্খলা, সরকারি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা থেকে খেলাধুলা—বিস্তৃত ক্ষেত্রে একগুচ্ছ প্রস্তাবে সিলমোহর দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সরকারের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সেই সিদ্ধান্তগুলির বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

চা-শিল্পের জন্যও রয়েছে একাধিক সিদ্ধান্ত। আলিপুরদুয়ারের সংকোশ চা-বাগানে নদীভাঙনে অব্যবহৃত হয়ে পড়া ১১৮.৪২ একর জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব হয়েছে। একই ভাবে জলপাইগুড়ির চামুর্চি চা-বাগানের ০.৬৯ একর জমি সীমান্ত চেকপোস্ট এবং ওসিআর কমপ্লেক্স তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ সাবসিডিয়ারি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘টি ট্যুরিজম অ্যান্ড অ্যালাইড বিজ়নেস পলিসি, ২০১৯’-এ সংশোধন এনে চা-বাগানের মোট জমির সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ, তবে সর্বাধিক ১৫০ একর পর্যন্ত, চা পর্যটন ও আনুষঙ্গিক ব্যবসায় ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

শিল্প ক্ষেত্রে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জমি লিজ় দেওয়াকে ঘিরে। বিভিন্ন শিল্প পার্কে জমি বরাদ্দের প্রস্তাবের ফলে প্রায় ৬৮ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। একাধিক শিল্প সংস্থাকে মোট কয়েকশো একর জমি লিজ় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, সরকার বদলের পরে শিল্প ও কর্মসংস্থানকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে মন্ত্রিসভা।


পরিবেশের ক্ষেত্রেও বড় প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছে। ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং, সাসটেনেবল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কার্বন ক্রেডিট প্রজেক্ট’-এর আনুমানিক ব্যয় ২,২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক (ADB) প্রায় ১,৫৭৫ কোটি টাকা সহায়তা করবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে। উচ্চমূল্যের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে দীর্ঘমেয়াদি, কম-কার্বন উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই প্রকল্প।

বিদ্যুৎ পরিকাঠামোতেও রয়েছে একাধিক সিদ্ধান্ত। উত্তর দিনাজপুরে নতুন ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন তৈরির জন্য সরকারি জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রস্তাব হয়েছে। জারগ্রাম জেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪৪.৯১ একর সরকারি জমি WBSEDCL-কে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কলকাতার এনএসসিবিআই বিমানবন্দরের ভিআইপি রোডে সাবওয়ে বা আন্ডারপাস তৈরির জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে এনওসি দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করার দিকেও নজর দিয়েছে নতুন সরকার। পশ্চিমবঙ্গে অ্যান্টি-নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স (ANTF) গঠনের পাশাপাশি দুর্গাপুর, মালদহ, খড়্গপুর ও নদিয়ায় চারটি ANTF থানা তৈরির প্রস্তাব হয়েছে। বিভিন্ন পদ মিলিয়ে এই ব্যবস্থায় মোট ৫৯১টি পদ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অ্যান্টি-টেররিস্ট স্কোয়াড (ATS)-এর জন্য ৪৬১টি নিয়মিত পদ এবং পাঁচটি চুক্তিভিত্তিক সফটওয়্যার ডেভেলপারের পদ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

নারী সুরক্ষা ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও সাংগঠনিক কাঠামো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কমিশনে বিভিন্ন শ্রেণির ৬৮টি পদ এবং কমিশন অন ইনস্টিটিউশনাল করাপশনে ৫৭টি পদ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতা হাই কোর্টের কার পুলে ১০টি চালকের পদ, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছয়টি ল’ অফিসার এবং আসানসোল ও দুর্গাপুর পুরনিগমে একটি করে ল’ অফিসারের পদ তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।

সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রেও বদলের ছাপ রয়েছে সিদ্ধান্তের তালিকায়। বদলির ক্ষেত্রে বর্তমান ট্রান্সফার গ্রান্ট ও প্যাকিং অ্যালাওয়েন্সের পরিবর্তে ‘কম্পোজ়িট ট্রান্সফার অ্যান্ড প্যাকিং গ্রান্ট’ চালুর প্রস্তাব হয়েছে। অবসরের ক্ষেত্রেও একই শর্তে প্যাকিং গ্রান্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আর খেলাধুলায় পুরস্কার ও সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব বিশেষ নজর কেড়েছে। অলিম্পিকে সোনা জিতলে ১ কোটি টাকা, রুপোয় ৭৫ লক্ষ এবং ব্রোঞ্জে ৫০ লক্ষ টাকা পুরস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, কমনওয়েলথ, এশিয়ান গেমস, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, জাতীয় গেমস ও জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ক্ষেত্রেও পদকজয়ীদের জন্য পৃথক আর্থিক পুরস্কারের কাঠামো রাখা হয়েছে।

এর পাশাপাশি ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি স্পোর্টস অ্যাসিস্ট্যান্স স্কিম’-এর মাধ্যমে জাতীয় ও রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং অংশগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার হয়ে সাফল্য পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সম্মানিক দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘মুখ্যমন্ত্রীর কৃতি ক্রীড়াবিদ সম্মান যোজনা’ চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, সরকার পরিবর্তনের পরে প্রথম দিকের মন্ত্রিসভা বৈঠকগুলির ধারাবাহিকতায় অষ্টম বৈঠকের সিদ্ধান্তে একদিকে প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর ইঙ্গিত, অন্য দিকে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করা এবং খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্য স্পষ্ট। জমি, শিল্প, পরিকাঠামো, পরিবেশ থেকে মানবসম্পদ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করাই এখন নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা