মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো মণ্ডপে যখন ভিড়ের চাপে দমবন্ধকর পরিস্থিতি আর হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছিল, ঠিক তখনই মাইকে ভেসে এসেছিল একটি আতঙ্কের ঘোষণা– মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে, সবাই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, চরম বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে মাইকের ওই একটি ঘোষণাই দর্শনার্থীদের মধ্যে মৃত্যুভয় ও হুড়োহুড়ি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই অভিশপ্ত ঘোষণার নেপথ্যে থাকা দুই সন্দেহভাজনের মধ্যে এক জনকে বৃহস্পতিবার নদিয়া থেকে আটক করল কলকাতা পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে খবর, আটক ব্যক্তির নাম সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। তিনি চোরবাগান পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ। সপ্তমীর রাতের ওই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকেই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন তিনি। সিসি-ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে যে দুই ঘোষককে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেন্টু তাঁদেরই অন্যতম। বৃহস্পতিবার নদিয়ার গোপন ডেরা থেকে পাকড়াও করার পর তাঁকে জেরার জন্য লালবাজারে নিয়ে আসা হচ্ছে। তবে পুলিশি তালিকায় থাকা অপর ঘোষক এখনও পলাতক।
গ্রিলে ঘেরা উড়ালপথে শ্বাসরোধ
চোরবাগান বিপর্যয়ের পর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও এবং মণ্ডপ চত্বরের সিসি-ক্যামেরার ফুটেজে সেদিনের ভয়াবহ ছবিটা স্পষ্ট হয়েছে। দেখা গিয়েছে, মণ্ডপের গ্রিলে ঘেরা ঘোরানো উড়ালপথের উপরেই ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে লুটিয়ে পড়ছেন দর্শনার্থীরা। অন্য একটি দৃশ্যে ধরা পড়েছে, প্রস্থানের গেট থেকে আট-দশ মিটার ভিতরে প্রবল ধাক্কাধাক্কির জেরে মাটিতে পড়ে গিয়েছেন বেশ কয়েক জন এবং চারপাশে কেবলই আর্তনাদ। সেখানে উপস্থিত এক পুলিশকর্মী ক্রমাগত ফোনে কারও সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন, আর মাটিতে পড়ে থাকা এক ব্যক্তি প্রাণ বাঁচাতে ওই পুলিশকর্মীকে ধরেই উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন।
ঠিক এই শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতির মাঝেই মণ্ডপের প্রস্থান পথের পাশে থাকা ক্লাব সদস্য ও বিশেষ অতিথিদের বসার ঘর থেকে মাইকে ঘোষণা করা হয় যে মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্তকারীদের মতে, এই ঘোষণার পরেই প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ ছুটতে শুরু করেন এবং পদপিষ্টের ঘটনা চরম আকার নেয়।
৮টি নম্বর ট্র্যাক করে জালে কোষাধ্যক্ষ
বিপর্যয়ের রাত থেকেই নিজের মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। পুলিশ তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েও কোনও হদিস পায়নি। তবে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, গোপন আস্তানায় বসে বিভিন্ন সময়ে অচেনা একাধিক নম্বর ব্যবহার করে নিজের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তিনি।
লালবাজারের তদন্তকারীরা এমনই আটটি সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর চিহ্নিত করে সেগুলির টাওয়ার লোকেশন ও কল ডিটেলস ট্র্যাক করতে শুরু করেন। সেই ডিজিটাল সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার নদিয়ায় সেন্টুর গোপন ডেরার সন্ধান মেলে এবং তাঁকে আটক করা হয়। ওই চরম মুহূর্তে কেন তিনি মাইকে এমন আতঙ্কজনক ঘোষণা করতে গেলেন বা এর পিছনে পুজো কমিটির প্রভাবশালী কারও নির্দেশ ছিল কি না– লালবাজারে বসিয়ে সেন্টুকে জেরা করে সেই উত্তরই পেতে চাইছেন গোয়েন্দাদের বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) আধিকারিকেরা।
ফাঁসানোর অভিযোগ পরিবারের
পুলিশি তদন্তে যে দুই সন্দেহভাজন ঘোষকের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের দুজনেরই বাড়ি মণ্ডপ থেকে মাত্র ৫০ মিটারের মধ্যে অমর বসু সরণিতে। পাশাপাশি দুটি বাড়িতেই তাঁরা থাকেন এবং ঘটনার পর থেকেই দুজনেই পাড়াছাড়া। এক অভিযুক্তের পিসি জানিয়েছেন, সপ্তমীর রাতের পর থেকে তাঁর ভাইপো আর বাড়ি ফেরেননি এবং পরিবারের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেননি।
অন্যদিকে পলাতক অপর সন্দেহভাজন পেশায় একজন অ্যাপ-ক্যাব চালক। তাঁর স্ত্রীর পাল্টা অভিযোগ, এই বিপর্যয়ের আসল দোষীদের আড়াল করতেই তাঁর স্বামীকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে। আপাতত সেন্টুকে জেরা করে পলাতক দ্বিতীয় ব্যক্তির হদিস পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।