সেনাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হামলার মামলা খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, মিথ্যা পুলিশ রিপোর্টের ভিত্তিতে একজন সেনাকর্মীকে দীর্ঘদিন ফৌজদারি বিচারের ‘লাঞ্ছনা ও মানসিক যন্ত্রণা’ সহ্য করতে বাধ্য করা হয়েছে।
কলকাতা হাই কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ, ‘হাজার মাইল দূরে থাকা সেনাকে একই সময়ে ঘটনাস্থলে থাকা শারীরিক ভাবে অসম্ভব’
হুগলিতে মারধরের অভিযোগে মামলা। অথচ অভিযোগের সময় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইম্ফলে সক্রিয় সামরিক দায়িত্বে ছিলেন অভিযুক্ত। সরকারি নথিতে সেই তথ্য প্রমাণিত হওয়ার পরই সেনাকর্মীর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্ট।
বিচারপতি উদয় কুমারের পর্যবেক্ষণ, এমন ‘মিথ্যে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ’ পুলিশ রিপোর্টের ভিত্তিতে একজন সেনাকর্মীকে বিচারের ‘লাঞ্ছনা ও মানসিক যন্ত্রণা’ সহ্য করতে বাধ্য করা বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
উত্তরপাড়া থানার ২০২৩ সালের একটি মামলায় দুই ভাই অরুণ প্রসাদ ও অর্জুন প্রসাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১, ৩২৩, ৫০৪ এবং ৫০৬ ধারায় মামলা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ সাতদল ক্লাবের কাছে অভিযোগকারীকে আটকে মারধর করেন তাঁরা। তাঁর বোনকে সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া, ৭,৫০০ টাকা কেড়ে নেওয়া এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
মামলার নেপথ্যে ছিল সারদাপল্লি, সেক্টর-২, মাখলার একটি চার ফুটের সাধারণ রাস্তা ও নিকাশি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে প্রতিবেশী পরিবারের দীর্ঘদিনের বিবাদ। বিষয়টি নিয়ে দেওয়ানি মামলাও চলছিল। কিন্তু তদন্তে বড়সড় মোড় আসে অরুণের ক্ষেত্রে। ইম্ফলের ২৫ BRTE-এর বি-কোম্পানির কমান্ডিং অফিসার সরকারি ভাবে জানান, অভিযোগের দিন এবং নির্দিষ্ট সময়ে অরুণ সক্রিয় সামরিক দায়িত্বে ইম্ফলেই ছিলেন। অর্থাৎ অভিযোগের ঘটনাস্থল হুগলিতে তাঁর উপস্থিতি কার্যত অসম্ভব।
এই তথ্য যাচাইয়ের পর তদন্তকারী অফিসার অরুণকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়ে তাঁর ক্ষেত্রে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেন। সেই সরকারি সামরিক নথিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হাই কোর্ট জানায়, এটি সাধারণ কোনও ‘আলিবি’র দাবি নয়; সেনার আধিকারিকের যাচাই করা সরকারি নথিতে অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে। বিচারপতির কথায়, “একই সময়ে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত দু’টি ভৌগোলিক স্থানে একজন মানুষের থাকা শারীরিক ভাবে অসম্ভব।”
আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারী সংস্থাই যখন অভিযুক্তের ঘটনাস্থলে অনুপস্থিতি যাচাই করে তাঁকে মামলা থেকে বাদ দিয়েছে, তখন তাঁর বিরুদ্ধে ফের ফৌজদারি বিচার চালিয়ে যাওয়া আইনপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার। এটা হরিয়ানা বনাম ভজন লাল মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত নীতির উল্লেখ করে হাই কোর্ট জানায়, মামলাটি স্পষ্টতই অসৎ উদ্দেশ্য ও প্রতিহিংসার ছাপ বহন করছে।
তবে অরুণের ভাই অর্জুনের ক্ষেত্রে একই সুবিধা দেয়নি আদালত। কারণ তিনি স্থানীয় বাসিন্দা এবং ঘটনার সময় তাঁর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন নেই। কেস ডায়েরিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং আঘাতের রিপোর্ট রয়েছে, যা প্রাথমিক ভাবে বেআইনি ভাবে আটকানো ও মারধরের অভিযোগকে সমর্থন করে বলে আদালতের মত।
দেওয়ানি বিবাদ থাকলেও তা নিজে থেকে ফৌজদারি মামলা খারিজের কারণ হতে পারে না বলেও স্পষ্ট করেছে আদালত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সত্য না মিথ্যা, ঘটনার প্রকৃত রূপ কী ছিল—এসব বিতর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলবে।
ফলে দুই ভাইয়ের আবেদনে আংশিক সাড়া দিয়ে অরুণ প্রসাদের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ করেছে হাই কোর্ট। তবে অর্জুনের বিরুদ্ধে মামলা খারিজের আবেদন নাকচ করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।