প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘পালবোব্রো’ ব্র্যান্ডের ১২৫ মিলিগ্রামের একটি প্যাকের দাম ৪০ হাজার ৪২১ টাকা থেকে কমে হয়েছে ২,৭২০ টাকা। অর্থাৎ, দাম কমেছে প্রায় ৯৩.৩ শতাংশ। একই ওষুধের ১০০ মিলিগ্রামের প্যাকের ক্ষেত্রে ‘আইসোজেন’ ব্র্যান্ডের দাম কমেছে ৯১.৬ শতাংশ। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যানাস্ট্রোজ়ল ‘ওয়োমাজ়লে’র দামও ৪৫৮ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৩৯ টাকা ৫২ পয়সা।
ক্যানসারের ওষুধের দামে এই বিপুল হ্রাসের নেপথ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ভর্ৎসনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জীবনদায়ী ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে শীর্ষ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সেই মামলার শুনানিতে ওষুধের দাম নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল বিচারপতি সন্দীপ মেহতা ও বিচারপতি বিক্রম নাথের বেঞ্চ।
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি মেহতা জানিয়েছিলেন, এমন ক্যানসারের ওষুধও রয়েছে, যা উৎপাদনকারী সংস্থা খুচরো বিক্রেতাকে ২,৭০০ টাকায় বিক্রি করছে। অথচ সেই ওষুধের সর্বাধিক খুচরো বিক্রয়মূল্য (এমআরপি) ২৭ হাজার টাকা। এই বিপুল ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি মেহতা বলেছিলেন, “এটা দিনে ডাকাতি ছাড়া আর কী! একজন রোগীর সঙ্গে এ ভাবে প্রতারণা করা যায়?” উৎপাদনকারী সংস্থা যে ওষুধ ২,৭০০ টাকায় দিচ্ছে, তা কী ভাবে ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে যাঁদের পদক্ষেপ করা উচিত, তাঁদের নীরবতাকেও দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন বিচারপতি।
এর পরেই গত সপ্তাহে ১৩৭টি নির্ধারিত তালিকার বাইরের ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে লাভের সীমা ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এনপিপিএ। তবে সেই পদক্ষেপের পরেও শীর্ষ আদালতের অসন্তোষ এড়াতে পারেনি সংস্থাটি। একই মামলায় গত মঙ্গলবারের শুনানিতে বিচারপতি মেহতা ও বিচারপতি নাথ প্রশ্ন তোলেন, ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারি নজরদারি নেই কেন? এনপিপিএ-র ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত। তার পরেই প্রকাশ্যে আসে ওষুধের সংশোধিত মূল্যতালিকা।
এনপিপিএ জানিয়েছে, ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে ভবিষ্যতে তালিকায় সংশোধনও করা হতে পারে।
ওষুধের দাম কমানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন স্তন ক্যানসার চিকিৎসক দীপ্তেন্দ্র সরকার। তাঁর কথায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত অগ্রগতির মূল লক্ষ্য। গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত জীবনদায়ী ওষুধ যদি মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়, তা হলে সেই গবেষণার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংশোধিত তালিকায় যে ওষুধগুলির দাম কমেছে, সেগুলি ক্যানসার রোগীদের আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে বলেও জানিয়েছেন তিনি। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রোগীদের কাছে আণবিক লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসক।
একই সুর ইনস্টিটিউট অফ ব্রেস্ট ক্যানসারের কর্ণধার চিকিৎসক সৌমেন দাসের গলাতেও। তাঁর মতে, ক্যানসারের ওষুধের দাম কমায় রোগীরা যে স্বস্তি পাবেন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে শুধু ওষুধের দাম কমানোই সাশ্রয়ী ক্যানসার চিকিৎসার পূর্ণ সমাধান নয়। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিলেও ওষুধের দাম কমার সুবিধা প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, ক্যানসারের অত্যন্ত দামি ওষুধগুলিকেও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।