দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নিজের এলাকায় অটুট প্রভাব আর লড়াকু রাজনৈতিক ইমেজ। এই ত্রয়ীর ওপর দাঁড়িয়েই কলকাতার রাজনৈতিক মানচিত্রে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন সন্তোষ পাঠক। একসময় প্রদেশ কংগ্রেসের দাপুটে মুখ হিসেবে যাঁর পরিচিতি ছিল, সেই তিনিই এবার গেরুয়া শিবিরে নতুন ইনিংস শুরু করেছেন। আর সেই শুরুটাই যেন চমকে ভরা।
বাংলার রাজনৈতিক মাটিতে যখন কংগ্রেস কার্যত প্রান্তিক, আর তৃণমূলের দাপট সর্বত্র, তখনও নিজের গড়ে কোনও ভাঙন ধরতে দেননি তিনি। কলকাতা পুরসভার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের জমাট উপস্থিতি তার প্রমাণ। তবে গত ২৪ মার্চ হঠাৎই বদলে যায় সমীকরণ। কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন সন্তোষ পাঠক।
তারপর মাত্র সাত দিনের মাথায় মঙ্গলবারে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় জায়গা পেলেন তিনি। চৌরঙ্গী কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হলো সন্তোষ পাঠকের নাম।
চৌরঙ্গী, যেখানে গত নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৪৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, সেই শক্ত ঘাঁটিতেই এবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন সন্তোষ। তবে এই লড়াই তাঁর কাছে নতুন নয়। এর আগে তিনবার বিধানসভা ভোটে লড়েছেন, জয়ের মুখ না দেখলেও রাজনৈতিক মাটি ছেড়ে সরে যাননি তিনি। বরং এবারের লড়াইয়ে আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। তাঁর কথায়, ‘চৌরঙ্গীর মানুষ এবার বদল চাইছে। আমার নাম ঘোষণার পর যে উচ্ছ্বাস দেখেছি, তাতে আমি অভিভূত। কংগ্রেসের যখন ছিলাম তখন বুথে বসার পর্যন্ত লোক থাকত না। বিজেপিতে সেই ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে লড়ার মানসিকতা আছে।‘ তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে তাঁর দাবি, ‘গতবার জোর করে, ছাপ্পা দিয়ে জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু এবার মানুষ তৈরি। পরিবর্তন নিশ্চিত।’
শুধু চৌরঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্র নয়, বাংলায় ক্ষমতার দখল নিয়েও আত্মবিশ্বাসী তিনি। তাঁর মতে, বাংলায় তৃণমূলের বিকল্প একমাত্র বিজেপি।
বিদায়ী বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ করেন, এতদিন চৌরঙ্গীর সাধারণ মানুষ তাঁদের বিধায়ককে কাছ থেকে পাননি। তবে তিনি নিজেকে ‘অ্যাক্সেসিবল’ নেতার জায়গায় রাখতে চান। তাঁর কথায়, ‘আমি মানুষের মাঝেই থাকি, মানুষের সঙ্গেই কাজ করি। যে যখন ডাকবে, তখনই পাশে থাকব।’
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্নে এসআইআর-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মৃত ও অবৈধ ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ায় এবার ভোট অনেক বেশি নির্ভুল ও স্বচ্ছ হবে। অন্যদিকে কলকাতা পুরসভা নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তিনি। বিরোধী কণ্ঠরোধের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘কলকাতা পুরসভায় প্রশ্ন করলেও উত্তর পাওয়া যায় না। পুরসভায় বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয় না। এমনকি আমার সামনে সজল ঘোষকে মারার হুমকিও দেওয়া হয়েছে, অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। খোদ মেয়র সেই কাজ করেছেন’
রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রশ্ন, কংগ্রেস ছাড়ার পর পুরনো ভোটব্যাঙ্ক কতটা তাঁর সঙ্গে থাকবে? সন্তোষ পাঠকের জবাব স্পষ্ট, ‘শুধু কংগ্রেস নয়, বাম ভোটের বড় অংশও এবার বিজেপির দিকেই আসবে।’
চৌরঙ্গীর লড়াই তাই এবার শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান বদলের এক বড় পরীক্ষা। পুরনো দল ছেড়ে নতুন দলে, অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে সন্তোষ পাঠক কতটা সফল হন এখন সেদিকেই নজর রাজ্য রাজনীতির।