জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষায় বলাগড়ের নৌ-শিল্প

হুগলির বলাগড়ের প্রাচীন নৌকা তৈরির শিল্প এবার জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) তকমা পাওয়ার দোরগোড়ায়। বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করা এই শিল্প একসময় সপ্তগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। ভাগীরথী, সরস্বতী ও বেহুলা নদী ঘেরা বলাগড় অঞ্চল মধ্যযুগ থেকেই নৌকা নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ছোট ডিঙি নৌকা থেকে শুরু করে বজরা, ময়ূরপঙ্খী এমনকি বড় জাহাজও তৈরি হত এখানে। পর্তুগিজ ব্যবসায়ী থেকে মাঝি-মাল্লা সকলের কাছেই বলাগড়ের কাঠের নৌকার চাহিদা ছিল প্রবল।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই জৌলুস অনেকটাই ফিকে হয়েছে। এখন হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় কোনওমতে টিকে আছে এই শিল্প। বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা, তেঁতুলিয়া থেকে থেকে কাঠের নৌকা যেত বিভিন্ন জায়গায় ৷ একসময় শাল কাঠ, সেগুন কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি হত ৷ এখন কম দামের বাবলা, আম কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি হয় ৷ নৌশিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন জানান, শাল বা সেগুন কাঠের নৌকা তৈরির বরাত কেউ দেয় না বললেই চলে। শিল্পীদের অভিযোগ, পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি খুবই কম, ফলে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। সরকারি সাহায্য ও বাজারের অভাবেও শিল্প ধুঁকছে। নৌ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছে এখনও বেশ কয়েকটি শিল্পী পরিবার। আগে ৪০টি পরিবার এই পেশায় যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন তা কমে কুড়িটিতে এসে ঠেকেছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা কেউ আগ্রহ না দেখালেও বাবা-ঠাকুরদার এই শিল্পকে আঁকড়ে বেঁচে রয়েছে কয়েকজন। বর্তমানে এই শিল্প এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।

এই পরিস্থিতিতে জিআই স্বীকৃতি শিল্পের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। গবেষকদের উদ্যোগে ২০২২ সাল থেকে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জমা পড়ে। শুনানি-সহ একাধিক ধাপ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। জিআই তকমা পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বলাগড়ের নৌকার আলাদা পরিচিতি তৈরি হতে পারে এবং ব্যবসার ক্ষেত্রও বাড়তে পারে বলে মনে
করছেন শিল্পীরা।


তবে তাঁদের মতে, শুধুমাত্র স্বীকৃতি পেলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার যদি বাজার তৈরি, আর্থিক সহায়তা ও নিয়মিত বরাতের ব্যবস্থা করে, তবেই শিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব। নচেৎ বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী নৌ-শিল্প ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।