২০ বছরেও কাটেনি জমি-জট, বৃষ্টিতে ভোগান্তি! নতুন সরকারের প্রত্যাশায় কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা

কুমোরটুলি আছে কুমোরটুলিতেই। অনেক অপেক্ষার পরে আজও আটচালাতেই তৈরি হয় দেবী প্রতিমা। অনেক প্রতিশ্রুতির শেষে আজ অবহেলার শিকার এশিয়ার বৃহত্তম পটুয়াপাড়া। আশা একটাই, নতুন সরকার যদি দারিদ্রতা দূর করতে পারে কুমোরদের।

কুমোরটুলির উন্নয়নের পরিকল্পনা হয়েছিল বাম আমলেই। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক মানের স্টুডিও তৈরির প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবে শিল্পীদের অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরানোর কাজও শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জমি-জটে আটকে যায় কুমোরটুলিকে ‘মডেল’ পাড়া হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা। বছরের পর বছর কেটে গেলেও সেই জট আর কাটেনি।

২০০৬ সালে সাংসদ হওয়ার পর কুমোরটুলির উন্নয়নে উদ্যোগী হয়েছিলেন সিপিএমের সুধাংশু শীল। কেএমডিএ-র তরফে শুরু হয়েছিল সমীক্ষার কাজও। প্রস্তাব অনুযায়ী, কুমোরটুলিকে এ, বি, সি এবং ডি—এই চারটি ব্লকে ভাগ করে সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০১০ সালে সি ব্লকের প্রায় ১০০ জন শিল্পীকে গোলাবাড়ির অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরিয়ে দেওয়া হয়।


শিল্পীদের তখন জানানো হয়েছিল, দেড় বছরের মধ্যেই তাঁদের ফের কুমোরটুলিতে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির পর কেটে গিয়েছে প্রায় দেড় দশক। এখনও অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্রেই রয়েছেন বহু শিল্পী। বদলায়নি তাঁদের পরিস্থিতি। বরং কাজের জায়গা থেকে শুরু করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে কুমোরটুলির বিভিন্ন এলাকা। প্রতিমা তৈরির জায়গায় জল ঢুকে নষ্ট হয় মাটি ও অন্যান্য উপকরণ। প্লাস্টিক দিয়ে প্রতিমা ঢেকে রাখার চেষ্টা করলেও সবসময় রক্ষা করা যায় না। শিল্পীদের বক্তব্য, ২০-২৫ বছর আগে যে সমস্যাগুলি ছিল, আজও তার অনেকটাই রয়ে গিয়েছে।

শিল্পীদের একাংশের অভিযোগ, বাম সরকার পরিবর্তনের পরও জমি-জট কাটিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাঁদের আরও অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পীদের নিয়ে একটি পৃথক সংগঠন তৈরি হলেও কুমোরটুলির দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলি সমাধানে সেই সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রত্যাশিত সক্রিয়তা দেখা যায়নি। কারণ তাদের ইচ্ছেও ছিল না। যার জেরে বাম আমলে যে প্রকল্পের কথা বলা হয়েছিল, সেই প্রকল্পটিরও কার্যত সলিল সমাধি ঘটে।

বর্তমানে জায়গার অভাবও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রঞ্জিত সরকার, য়ুগ্ম সম্পাদক, কুমারটুলি মৃৎশিল্প সাংস্কৃতিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক রঞ্জিত সরকার জানিয়েছেন, অল্প জায়গার মধ্যেই থাকা এবং প্রতিমা তৈরির কাজ করতে হয়। ফলে একসঙ্গে একাধিক প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক শিল্পীর ঘরের ছাদ টিনের তৈরি হওয়ায় বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জল আটকাতে বারবার প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকার ব্যবস্থা করতে হয়।

মৃৎশিল্পী সুজিত পাল জানিয়েছেন, কুমোরটুলির সমস্যাকে শুধু একটি এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই দীর্ঘদিনের জমি-জটের সমাধান, পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র, কাঁচামাল রাখার জায়গা এবং বর্ষার জল থেকে সুরক্ষার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের।

নতুন সরকারের কাছে তাই শিল্পীদের প্রত্যাশা, এবার অন্তত দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও কাজের পরিবেশ তৈরি হলে কুমোরটুলির শিল্পীরা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন। তাঁদের আশা, এর মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পও নতুন করে বিস্তার লাভ করবে।