সবুজ গালিচায় গাড়ির মেলা, ফিরল ইতিহাস

সবুজ গালিচায় বিভিন্ন রঙের গাড়ির মেলা। গাড়ি নয়, যেন এক একটা ইতিহাস দাঁড়িয়ে রয়েছে আরসিটিসি পোলো গ্রাউন্ডে। কোনও গাড়ি একসময় কিংবদন্তি গায়ক হেমন্ত মুখােপাধ্যায়ের মালিকানাধীন ছিল, আবার কোনোটি বিশ্বের বিরলতম রোলস রয়েসের মধ্যে একটি। ফের একবার ইতিহাসের সাক্ষী কলকাতা শহর। দ্য স্টেটসম্যান গ্রুপের উদ্যোগে রবিবার আয়োজিত হয় দ্য স্টেটসম্যান ভিনটেজ ও ক্ল্যাসিক কার র‍্যালি।

এবছর ৫৫ তম বছরে পদার্পণ করেছে এই র‍্যালি। রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব (আরসিটিসি) গ্রাউন্ড থেকে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে র‍্যালির ফ্ল্যাগ অফ করেন আর্মি কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল রামচন্দ্র তিওয়ারি, ইস্টার্ন কমান্ড। সেখান থেকে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে গাড়িগুলি ফের ফিরে আসে আরসিটিসি গ্রাউন্ডে। দুপুর ৩টে নাগাদ হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এই র‍্যালিতে প্রায় ১৬০টি ভিনটেজ ও ক্ল্যাসিক গাড়ি এবং ৫০টি দু’চাকার যান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল ৫২টি ভিনটেজ গাড়ি, ৩৫টি ক্ল্যাসিক গাড়ি, ৮টি নিও-ক্ল্যাসিক গাড়ি, ৭টি ভিনটেজ বাইক ও ১৮টি ক্ল্যাসিক বাইক। বিজয়নগরের হিরে ছবির পুরো টিমকে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এরপর জনপ্রিয় গায়ক অনীক ধর অনুষ্ঠানের মঞ্চ মাতান। আরসিটি গ্রাউন্ডে একাধিক খাবার সহ বিভিন্ন স্টলের আয়োজন করা হয়েছিল।

প্রসেনজিৎ ছাড়াও অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল, অভিনেতা অনুজয় চট্টোপাধ্যায় সহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন চলচ্চিত্র জগতের একাধিক মুখ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কেয়া শেঠ অ্যারোমাথেরাপির প্রতিষ্ঠাতা কেয়া শেঠ। দ্য স্টেটসম্যানের গ্রুপের তরফে উপস্থিত ছিলেন এডিটর ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর রবীন্দ্র কুমার, ডিরেক্ট বিনীত গুপ্তা, দ্য স্টেটসম্যানের ইস্ট ইন্ডিয়া রিজিয়নের বিজনেস হেড গোবিন্দ মুখার্জি, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. সুমন ভট্টাচার্য, দৈনিক স্টেটসম্যানের কনসাল্টিং এডিটর সৈয়দ হাসমত জালাল, দ্য স্টেটসম্যানের ইভেন্ট ও অ্যাক্টিভেশন হেড নীতীশ কাপুর ও দৈনিক স্টেটসম্যানের চিফ রিপোর্টার দেবাশিস দাস।


এই প্রতিযোগিতায় সবথেকে পুরনো গাড়ি হিসেবে র‍্যালি সম্পন্ন করার জন্য ইন্ডিয়ান ওয়েল ট্রফি জিতেছে ১৯১৫ সালের স্টোয়ার গাড়িটি। গাড়িটির বর্তমান মালিক আনন্দ চৌধুরি। সবথেকে বেশি স্পোর্টিং এফোর্টের জন্য দ্য সিনক্লেয়ার্স ট্রফি জিতেছে ১৯৩২ সালের ফোর্ড। অনামিত সেন মেমোরিয়াল ট্রফি জিতেছে ১৯৩৬ সালের বেন্টলে। বেস্ট পারফরম্যান্সের জন্য দ্য স্টেটসম্যান ট্রফি জিতেছে ১৯২৬ সালের স্টুডবেকার। এই গাড়ির মালিক হলেন সুপ্রিয়া রায়।

অংশগ্রহণকারী গাড়িগুলির মধ্যে সবথেকে পুরনো গাড়িটি হল ১৯০৬ সালের রেনো ফ্রেরেস। এই গাড়িটি ‘দ্য লেডি ইন রেড’ নামে পরিচিত। ১১৮ বছরের পুরনো ফরাসি এই গাড়িটির বর্তমান মালিক শ্রীবর্ধন কানোরিয়া। এদিন র‍্যালিতে তিনি নিজেই এই গাড়িটি চালিয়েছেন। র‍্যালিতে কানোরিয়াদের ১৯৩০ সালের বিরল রোলস রয়েস ফ্যান্টম I গাড়িটিও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এছাড়াও অংশগ্রহণকারী গাড়িগুলির মধ্যে ছিল রায় পরিবারের ১৯২৮ সালের স্টুডবেকার প্রেসিডেন্ট ৮ স্টেট লিমুজিন। এটি একটি বিরল ৮টি সিলিন্ডার বিশিষ্ট গাড়ি। এই ধরনের বিরল গাড়ি গোটা পৃথিবীতে আর মাত্র কয়েকটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই গাড়িতে চালকের আসন ও গাড়ির কেবিনের মাঝে রয়েছে একটি কাচের পার্টিশন। এছাড়াও ব্রডক্লথ আসবাবপত্র, রাজকীয় মোটরিং অভিজ্ঞতা এবং সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সংস্কারের কাজের মাধ্যমে গাড়িটি হয়ে উঠেছে অনন্য।

র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছে ১৯৪৮ সালের প্লাইমাউথ স্পেশাল ডিলাক্স গাড়িটিও। এই গাড়িটির ডাক নাম ‘নীলু’। একসময় কিংবদন্তি গায়ক হেমন্ত মুখার্জির মালিকানাধীন ছিল গাড়িটি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গাড়িটি রয়েছে লাহিড়ী পরিবারের কাছে। ৬ সিলিন্ডার–বিশিষ্ট নীল রঙের এই সেডানটি বহু ঐতিহ্য ও স্মৃতি বহন করছে। ১৯৩৭ সালের রোলস রয়েস ফ্যান্টম III গাড়িটিও অংশগ্রহণকারী গাড়িগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই গাড়িটি এক সময় ভাইস–রিগাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে গাড়িটি আজম মোনেমের পরিবারের কাছে রয়েছে। গাড়িটিতে রয়েছে ভি১২ ইঞ্জিন। বিশ্বের বিরলতম রোলস রয়েসগুলির মধ্যে এই গাড়িটি হল অন্যতম।

মোনেম জানিয়েছেন, বর্তমানে এই ধরনের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা খুবই কঠিন কাজ। আধুনিক জ্বালানি পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত কারিগরও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই দিনের পর দিন এই গাড়িগুলিকে চলমান রাখা খুবই কষ্টকর। দ্য স্টেটসম্যানের ভিনটেজ ও ক্ল্যাসিক কার র‍্যালি ভারতের বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গাড়ি প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে দিল্লিতে প্রথমবার ভিনটেজ অ্যান্ড ক্ল্যাসিক কার র‍্যালির আয়োজন করা হয়েছিল। ১৯৬৮ সাল থেকে কলকাতায় এই র‍্যালিটি আয়োজিত হচ্ছে।