৬৩ কোটির মাদক মামলায় অন্তঃসত্ত্বা অভিযুক্তার পাশে মানবিক হাইকোর্ট, শর্তসাপেক্ষে মিলল অন্তর্বর্তী জামিন

৬৩ কোটির মাদক মামলায় অন্তঃসত্ত্বা অভিযুক্তার পাশে মানবিক হাইকোর্ট (Photo: AI)

গর্ভবতী হওয়া মানেই জামিনের অধিকার তৈরি হয় না। বিশেষ করে এনডিপিএস আইনের মতো কঠোর আইনে। মাদক উদ্ধারের অভিযোগ থাকলে ধারা ৩৭-এর বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে একজন অন্তঃসত্ত্বা বন্দির স্বাস্থ্য, অনাগত সন্তানের সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে আদালত উপযুক্ত ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী স্বস্তি দিতে পারে। এই পর্যবেক্ষণেই ৬৩ কোটি টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধারের মামলায় গ্রেপ্তার এক অন্তঃসত্ত্বা অভিযুক্তাকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ।

এনসিবির(নারকোটিক কন্ট্রোল ব্যুরো) দাবি, গত ৩ এপ্রিল কলকাতার তিনটি পৃথক জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ এমডিএমএ, কোকেন, এলএসডি, অ্যাম্ফেটামিন, গাঁজা ও ট্রামাডল মতো নিষিদ্ধ মাদক উদ্ধার করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি উদ্ধার হয় ৪ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা নগদ। তদন্তকারীদের দাবি, বাজেয়াপ্ত মাদকের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে অভিযুক্তার যোগ রয়েছে। গোটা ঘটনাটির এখনও তদন্ত চলছে। এই মুহূর্তে জামিন দিলে তদন্তে যথেষ্ট প্রভাবিত করতে পারেন।

আদালতে এনসিবির পক্ষের আইনজীবী অরুন কুমার মাইতি ও আইনজীবী ঋষিরাজ রীতম্ভর মহান্তি আদালতে জানান, অভিযুক্তার নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা এসএসকেএম হাসপাতাল ও সংশোধনাগার হাসপাতালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার জন্য জামিনের প্রয়োজন নেই। উপরন্তু, জামিন পেলে তদন্তে প্রভাব পড়া, সাক্ষীদের প্রভাবিত করা বা প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কাও রয়েছে।


অন্যদিকে, অভিযুক্তার পক্ষের আইনজীবী সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ও আইনজীবী অর্ক কুমার নাগ আদালতে জানান, গ্রেপ্তারের সময় তিনি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বর্তমানে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। চিকিৎসকদের মতে, আগামী ১৩ আগস্ট তাঁর সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ। সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাইকোর্টের একাধিক রায়ের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, উন্নত পর্যায়ের গর্ভাবস্থায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত এবং সম্ভব হলে কারাগারের বাইরে সন্তান প্রসবের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: মালদার কালিয়াচকে বেআইনি রথের মেলা,  জমি দখলমুক্ত করতে এসডিওকে নিদের্শ হাইকোর্টের

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ তাঁর নিদের্শনামায় উল্লেখ করেন, মামলার গুরুত্ব বা তদন্তের জটিলতা অস্বীকার করা যায় না। আবেদনকারীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক উপাদানও রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আদালত মনে করিয়ে দেয়, একজন বন্দি নারীও সংবিধান প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না। কারাগারে সন্তানের জন্ম মা ও নবজাতক, উভয়ের ওপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কারণেই কঠোর শর্তে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত। এর পাশাপশি আবেদনকারীকে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে। অবস্থানের তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে জানাতে হবে এবং কলকাতা পুরসভার এলাকার বাইরে যাওয়া চলবে না। কোথায় চিকিৎসা নেবেন তাও তদন্তকারীকে জানাতে হবে।

২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, গর্ভাবস্থা জামিনের স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। তবে উপযুক্ত ক্ষেত্রে মানবিকতা, মা ও অনাগত শিশুর স্বার্থ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে আদালত অন্তর্বর্তী স্বস্তি দিতেই পারে।