জন্ম হুগলির তারকেশ্বরের নালিকুলে। বাবা-মা দু’জনেই ভারতীয় নাগরিক। তিন বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে যেতে হয় পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পরে পাকিস্তানের পাসপোর্ট ও ভিসা সমর্পণ করে ১৯৮১ সালে পরিবার-সহ ভারতে ফিরে আসেন ফতেমা বেগম। তারপর কেটে গিয়েছে চার দশকেরও বেশি সময়। কিন্তু আজও মেলেনি ভারতীয় নাগরিকত্ব। উল্টে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার অভিযোগে এক বছর জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে। এবার সেই ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের কড়া প্রশ্ন— যদি ফতেমা দোষী না হন, তবে তাঁর এক বছরের কারাবাসের ক্ষতিপূরণ দেবে কে? ভারত সরকার, না পাকিস্তান সরকার?
শনিবার বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের এজলাসে এই মামলার শুনানিতে উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। আবেদনকারীর আইনজীবী তন্ময় চৌধুরী জানান, ২০০২ সালেই ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন ফতেমা। সেই আবেদনের একটি ডকেট নম্বরও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর দুই দশক ধরে কখনও রাজ্য, কখনও কেন্দ্র— একে অপরের কাছে চিঠি চালাচালি করলেও সেই আবেদনপত্রের আর কোনও হদিস মেলেনি।
মামলাকারির আইনজীবির আরও দাবি, পাকিস্তান থেকে ভারতে ফেরার পর ফতেমা ও তাঁর বাবা-মা বৈধ ভিসায় বসবাস করতেন। বাবা-মা সহজেই ভারতীয় নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেলেও ফতেমার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ভিসা নবীকরণ করেন। এরপরও নাগরিকত্বের আবেদন ঝুলেই থাকে। ২০০৮ সালের পর কার্যত আশা ছেড়ে দেন তিনি।
২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে পাকিস্তানি নাগরিকদের দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গ সামনে আসতেই নতুন বিপদ নেমে আসে। চন্দননগর থানার পুলিশ ফতেমার নথি যাচাই করে দেখতে পায় তাঁর ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় এক বছর জেলে থাকার পর কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এর আগে বিচারপতি অমৃতা সিনহা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফতেমার নাগরিকত্বের আবেদনপত্র উদ্ধার করে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। পরে শীর্ষ আদালত মামলাটি পুনরায় কলকাতা হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেয়।
শনিবারের শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেন, হারিয়ে যাওয়া নাগরিকত্বের আবেদনপত্র চিহ্নিত করে আগামী ২৬ আগস্টের মধ্যে আদালতে পেশ করতে হবে। কোথায় সেই ফাইল গেল, তারও জবাব দিতে হবে।
শুনানিতে বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করেন, ফতেমা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন— এমন প্রমাণ এখনও আদালতের সামনে নেই। তিনি বিদেশি নাগরিক কি না, তাও এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। অথচ তাঁকে এক বছর কারাবাস করতে হয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে সেই অন্যায় বন্দিত্বের দায় নেবে কে?
আগামী ২৬ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানিতে হারিয়ে যাওয়া ফাইলের রহস্য উন্মোচন হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।