শুভম বসু : কল্যাণ চক্রবর্তীর জীবনে রাজনীতি এসেছে অনেকটা ঘুরপথে। পেশায় কৃষি বিজ্ঞানী, আম গবেষণায় ডক্টরেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, এই পরিচয়গুলোর সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন মাঠে-ময়দানে কাজ করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধান শুধু গবেষণাগারে বসে সম্ভব নয়। সেই ভাবনা থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে আসা। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে খড়দহের মতো কঠিন কেন্দ্রে বিজেপির টিকিটে জিতে তিনি এখন রাজ্যের মন্ত্রীসভায়।
কথাবার্তায় কল্যাণ চক্রবর্তী একেবারেই মাপা। বক্তৃতার চেয়ে অভিজ্ঞতার কথা বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ তিনি। কর্মজীবনে চা-বাগানের ম্যানেজার থেকে কৃষি উন্নয়ন আধিকারিক— নানা দায়িত্ব সামলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণাও করেছেন দীর্ঘদিন। তবে মাঠে ঘুরে কৃষকদের সমস্যাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল বলে দাবি তাঁর।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের টানাপোড়েন নিয়েও সরব হয়েছেন কল্যাণ চক্রবর্তী। সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘এগুলো মানুষের কাছে মুখশুদ্ধির মতো কাজ করবে। মানুষ এখন শুধু অভিযোগ শুনতে চায় না, কাজ দেখতে চায়। আসল কাজ করবে ভারতীয় জনতা পার্টি।’ তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের ভিতরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, এখন তা প্রকাশ্যে আসছে।
রাজ্যের কৃষি পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ছোট ও মাঝারি কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। জৈব ও সমন্বিত কৃষির উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে সবজি চাষ, মাছচাষ ও পশুপালনের মতো মডেল ছোট চাষিদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
পূর্বতন সরকারকে আক্রমণ করে কল্যাণ চক্রবর্তী বলেন, গত ১৫ বছরে রাজ্যে কৃষকদের দুর্দশা বেড়েছে। কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে চাষের খরচ বেড়েছে, বহু কৃষক সঙ্কটে পড়েছেন। সাধারণ মানুষও মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল হয়ে উঠেছিলেন বলে দাবি তাঁর।
খড়দহের প্রসঙ্গে তিনি জলাবদ্ধতা, দূষণ, বেকারত্ব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শিল্পায়নের পক্ষে সওয়াল করলেও তাঁর দাবি, তা এমনভাবে করতে হবে যাতে পরিবেশ ও কৃষিজমির ক্ষতি না হয়। পাঁচ বছর পরের বাংলা কেমন দেখতে চান? উত্তরে সংক্ষিপ্তভাবেই তিনি বলেন, ‘চাই মানুষ কাজ পাক, কৃষক চাষ করে টিকে থাকুক, আর জীবনটা একটু সহজ হোক।’ রাজনীতির বাইরেও ‘দেশের মাটি কল্যাণ মন্দির’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত রয়েছেন কল্যাণ চক্রবর্তী।
সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তা অনেক সময় প্রকৃত উপভোক্তার কাছে পৌঁছয় না। তাই স্থানীয় স্তরে ছোট টিম তৈরি করে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছনোর পক্ষে তিনি।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশাও বেড়েছে। সেই চাপ অনুভব করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব বাড়লে চাপ তো থাকবেই। তবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই কাজ করতে চাই।’
রাজনীতির মঞ্চে নতুন ভূমিকা শুরু হলেও, কল্যাণ চক্রবর্তীর কথায় বারবার ফিরে আসে মাটি, কৃষক আর সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গ। এখন দেখার, সেই কথাগুলো আগামী দিনে বাস্তবের মাটিতে কতটা জায়গা করে নিতে পারে।