জুবিন গর্গের মৃত্যু-রহস্যে নতুন মোড়, শিল্পী অমৃতপ্রভার জামিনের আবেদন খারিজ

অসমের সাংস্কৃতিক জগতের আইকন শিল্পী জুবিন গর্গের রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড়। এই মামলায় অভিযুক্ত সহশিল্পী অমৃতপ্রভা মহন্তর জামিনের আবেদন শুক্রবার খারিজ করে দিল গুয়াহাটির একটি স্থানীয় আদালত। রাজ্য সরকার গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) তাঁকে খুনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে জেলে রেখেছে।

আদালতে সরকার পক্ষের কৌঁসুলি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘অমৃতপ্রভা মহন্ত খুনের ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা বিপজ্জনক হতে পারে।’ আদালত সেই যুক্তিতেই তাঁর আবেদন খারিজ করে। একই সঙ্গে মামলায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী (পিএসও)-র জামিনের আবেদনও নাকচ করা হয়েছে।

এই শুনানির পর জুবিন গর্গের স্ত্রী গরিমা গর্গ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার উপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, জুবিনের অকাল মৃত্যুর পিছনে যারা দায়ী, তারা কঠোর শাস্তি পাবে।’


তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সিঙ্গাপুরে একটি বিলাসবহুল ইয়টে গুরুতরভাবে মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন জুবিন গর্গ। সিঙ্গাপুর পুলিশের রিপোর্ট আদালতে পেশ করে জানানো হয়েছে, ইয়টে ওঠার আগেই এবং যাত্রাপথে তিনি প্রচুর মদ্যপান করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি জিন, হুইস্কি ও গিনেস স্টাউট-সহ একাধিক ধরনের মদ পান করেছিলেন।

তদন্তকারী আধিকারিক আদালতে জানান, জুবিন প্রথমে জলে নামেন, কিছুক্ষণ পরে ইয়টে ফিরে এসে বলেন তিনি ক্লান্ত। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই জলে নামেন। এরপরই তিনি জলে তলিয়ে যান।

তদন্তে তাঁর শারীরিক ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হয়েছে। আদালতে জানানো হয়, জুবিন গর্গ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও মৃগী রোগে ভুগছিলেন। ২০২৪ সালে তাঁর শেষ মৃগীজনিত খিঁচুনির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ফরেনসিক রিপোর্টে তাঁর রক্তে এই দুই রোগের ওষুধের উপস্থিতিও মিলেছে। তবে ঘটনার দিন তিনি মৃগীর ওষুধ নিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি বলে তদন্তকারীরা জানান।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আদালতে বলেন, ‘জিহ্বা কাটা বা অন্য কোনও শারীরিক লক্ষণ পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে জলে নামার আগে তিনি মৃগীর খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।’

ইয়টের ক্যাপ্টেন ‘ক্রেজি মানকি’ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, জুবিন গর্গ এতটাই নেশাগ্রস্ত ছিলেন যে, ইয়টে ওঠার সময় দু’জন বন্ধুকে ধরে তাঁকে উঠতে হয়েছিল। ক্যাপ্টেনের বক্তব্য, ‘যাত্রার আগে থেকেই কয়েকজন যাত্রী মদ্যপান করছিলেন। আমি দু’বার নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছিলাম।’ তিনি আরও জানান, দ্বিতীয়বার যখন জুবিন লাইফ জ্যাকেট ছাড়া জলে নামেন, তখন তিনি তাঁর এক বন্ধুকে সতর্ক করেন। পরে জুবিনকে জলে উপুড় হয়ে ভাসতে দেখে তিনিই প্রথম জলে ঝাঁপ দিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করেন।

পুলিশ সূত্রে আদালতে জানানো হয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী জুবিন স্বেচ্ছায় জলে নেমেছিলেন। এখানে আত্মহত্যার কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই কারণেই এসআইটি মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, জুবিন গর্গের মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। অমৃতপ্রভা মহন্তর জামিন খারিজ হওয়ায় স্পষ্ট, এই মামলায় আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ ও জটিল হতে চলেছে। বিচার প্রক্রিয়ার দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে অসমবাসী ও অগণিত জুবিন-অনুরাগী।