রাজস্থানের স্কুলে স্কুলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একদল তরুণ। হাতে ক্যামেরা, চোখে প্রশ্ন। ভাঙা দেওয়াল, ফাঁকা মাঠে ক্লাস, টিনের চাল থেকে চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জল, সবটাই ধরা পড়ছিল তাঁদের লেন্সে। আক্রান্তও হতে হল তাঁদের। ফল যা হওয়ার তাই হল। রাজ্য সরকার শেষমেশ বিধানসভায় স্বীকার করে নিল, রাজ্যের ৬১১টি সরকারি স্কুলের নিজস্ব কোনও ভবনই নেই। কোথাও ক্লাস চলছে খোলা আকাশের নীচে, কোথাও আবার গোয়ালঘরের মতো অস্থায়ী ছাউনিতে। খবরটা শুধু রাজস্থানের নয়। প্রশ্ন উঠছে, বাংলার স্কুলগুলিরই বা হাল কেমন? উত্তর লুকিয়ে আছে কেন্দ্রীয় নিরীক্ষা সংস্থা বা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (Comptroller and Auditor General, CAG) সাম্প্রতিক রিপোর্টে।
রাজস্থানে ঠিক কী হয়েছে
সমগ্র শিক্ষা (Samagra Shiksha) প্রকল্পের আওতায় প্রকাশিত ইউডিআইএসই প্লাস (UDISE+) তথ্য বলছে, রাজস্থানের ৬৪ হাজারের বেশি সরকারি স্কুলের মধ্যে ৬১১টির কোনও ভবনই নেই। প্রায় ২০ হাজার স্কুলে শৌচাগার নেই। বিরোধী দলের অভিযোগ, গত বছরের একটি নিরীক্ষায় ধরা পড়েছিল, প্রায় সাড়ে তিন হাজার সরকারি স্কুলের ভবন সংস্কারের অভাবে রীতিমতো বিপজ্জনক। খবরটা এখন সামনে আসছে ককরোচ জনতা পার্টির (Cockroach Janta Party, CJP) তদন্তদলের পরিদর্শনের পর। স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে তাদের এক প্রতিনিধিদল আক্রান্তও হয়েছে।
আসলে এই গল্পের শুরু আরও আগে। গত বছর জালোরে একটি সরকারি স্কুলের ছাদ ভেঙে সাত জন পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনার পরেই রাজস্থান হাইকোর্ট রাজ্যের প্রায় ৮৭ হাজার জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকও সব রাজ্যকে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নিরীক্ষা (safety audit) চালানোর নির্দেশ দেয়।
বাংলার স্কুলে কি একই ছবি
পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি স্কুল-ভবনহীনতার এমন চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে না এলেও, ক্যাগের রিপোর্ট বলছে পরিকাঠামোর ছবিটা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের নিজস্ব হিসেব অনুযায়ী, রাজ্যের ৬৩ হাজারের বেশি স্কুলের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ স্কুলে কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষা (structural safety audit) হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা (Disaster Management Plan, DMP) তৈরি হয়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ স্কুলে। অথচ নিয়ম বলছে, প্রতিটি স্কুলেই এই পরিকল্পনা থাকা বাধ্যতামূলক।
আরও উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়ে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অনুমোদিত প্রায় ৪০০০ নির্মাণকাজ, যার মধ্যে ছিল অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, র্যাম্প তৈরির প্রকল্প, তা শুরুই হয়নি বলে ধরা পড়েছে নিরীক্ষায়। শেষে বাধ্য হয়ে সরকার প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি টাকার সেই বরাদ্দ ফেরত দিয়ে দেয়। শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়ার ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার্থী-শ্রেণিকক্ষ অনুপাতে (Student-Classroom Ratio, SCR) মাধ্যমিক স্তরে ৩৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৬৬ শতাংশ স্কুলে ধার্য মাপকাঠি মানা হচ্ছে না।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পড়ুয়াদের (Children with Special Needs, CwSN) জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। রাজ্যের ৭২ শতাংশ স্কুলে তাদের জন্য উপযুক্ত শৌচাগার নেই, ১৫ শতাংশ স্কুলে নেই র্যাম্প। এমনকি নিরীক্ষকরা সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন, বাঁকুড়া, উত্তর দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদের কয়েকটি রিসোর্স রুম কার্যত ব্যবহার হচ্ছে গুদামঘর হিসেবে।
রাজ্য সরকারের অবস্থান
তবে হাত গুটিয়ে বসে নেই বর্তমান রাজ্য সরকারও। সম্প্রতি রাজ্যের বারো হাজারের বেশি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলকে চিহ্নিত করে একটি বড় সংস্কার প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছে। তালিকাভুক্ত স্কুলগুলি সর্বোচ্চ পঁচিশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে আধুনিক পরীক্ষাগার, মাঠ ও ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ তৈরির জন্য।