ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস এখনও জেলবন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার বিভিন্ন মামলা এনেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। ইতিমধ্যে তাঁকে দু’বার আদালতে তোলা হলে প্রথমবার তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবীকে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। কারণ মৌলবাদীদের তরফে আইনজীবীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি সন্ন্যাসীর হয়ে দাঁড়ানো আইনজীবীকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টাও হয়। সেদিন আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়েই সন্ন্যাসীকে জেল হেফাজতে পাঠায় বাংলাদেশের আদালত। দ্বিতীয়বার চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের হয়ে আদালতে সওয়াল করতে যান আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ।
কিন্তু সেবারও ভরা এজলাসে প্রবীণ আইনজীবীকে হেনস্থা করা হয় এবং তাঁকে চিন্ময়কৃষ্ণের হয়ে সওয়ালও করতে দেওয়া হয়নি। আগামী ২ জানুয়ারি ফের আদালতে জামিন মামলা ওঠার কথা। সেই মামলার তারিখ এগিয়ে আনার জন্য আর্জির শুনানি হয়নি। এরই মধ্যে ভারতে এলেন চিন্ময়কৃষ্ণের আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ। সন্ন্যাসীকে ন্যায়বিচার দিতে নয়া কৌশল সাজাচ্ছেন তিনি। সোমবার ব্যারাকপুরে একটি বিশেষ কাজে এসে এই বিশিষ্ট আইনজীবী চিন্ময়কৃষ্ণের জীবন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘আমি ওঁর প্রাণহানির আশঙ্কা করছি।’
সোমবার ঢাকা থেকে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসেন প্রবীণ আইনজীবী। তিনি জানান, সাত-আট দিন এখানে থাকব। এর আগে এইমস হাসপাতালে তাঁর অপারেশন হয়েছিল। তারই ফলো আপ চিকিৎসা করাতে এসেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্র ঘোষ বাংলাদেশের চরম বিশৃঙ্খল এবং অশান্ত পরিবেশ নিয়ে জানালেন, ‘আইনজীবী হিসাবে গত ৩৮ বছর ঢাকায় প্র্যাকটিস করছি। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মুখে পড়িনি কখনো। প্রাণের ভয়ে চিন্ময়কৃষ্ণের হয়ে কেউ না দাঁড়ালেও আইনজীবী হিসেবে আমার কর্তব্য করতে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামে, চিন্ময়কৃষ্ণের হয়ে লড়তে। কতকগুলো মামলা দেওয়া হয়েছে, যা জামিন অযোগ্য। এক আইনজীবী খুন হয়েছেন। পুলিশ তদন্ত করছে। খুনিকে ভিডিওতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনায় ৭১ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধেই মামলা করেছে প্রশাসন। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা কেন? তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।’
তবে রবীন্দ্র ঘোষ লড়াইয়ের নয়া কৌশল তৈরি করছেন বলেই জানালেন। বললেন, ‘২ তারিখ আমি আবার যাব আদালতে। ফাইট করবই। ওঁর মৃত্যুর ভয় আছে বলে মনে করছি। কেন আমাদের ঢুকতে দেওয়া হবে না? তা প্রশাসনকে জানাতেই হবে। এটাই আইন।’
রবীন্দ্রবাবু আরও জানান, আগের শুনানি ভেস্তে গেলেও তিনি চিন্ময়কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয় তা শিউরে ওঠার মতো।
রবীন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘‘আমি চিন্ময়কৃষ্ণ প্রভুকে দেখার জন্য ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ প্রিজন্সের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি। তিনি অনুমতি দিচ্ছিলেন না। মিনিস্ট্রি অফ হোম অনুমতি দিয়েছিল। আইনজীবী হিসাবে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি নিই। তারপর জেলে যাই। চিন্ময়কৃষ্ণ প্রভু দেখা করতে এলেন। কান্না জড়ানো কন্ঠ তাঁর। চোখে জল এসে গিয়েছে। উনি বলেন, ‘বাবা কেমন আছেন?’ আমি বললাম, ‘আপনি কেমন আছেন?’ বলতেই আমাকে জড়িতে ধরলেন। চিন্ময়কৃষ্ণের সঙ্গে সেখানে আরও দু’জন সাধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চিন্ময় প্রভুর শারীরিক অবস্থা মোটেও ভালো নেই। ওখানে ওনাকে ভালো করে খেতে বা ওষুধ কিছুই দেওয়া হচ্ছে না। যেভাবে চলছে তাতে যেকোনো সময় ওনার প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে জেলের ভেতরেই। সেখানে ওনার একটা ফটো তুললেও সেটা আমাকে ডেপুটি জেলার দেননি। আমাকে বলেছিলেন, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু পাঠাননি।’’
আইনজীবী আরও বলেন, ‘আমাকে সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়ার জন্য চার ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করিয়ে রাখে জেল কর্তৃপক্ষ। চিন্ময়কৃষ্ণ কী কথা বলেছেন, সেটাও জেল কর্তৃপক্ষ রেকর্ড করেছে, যা কোনওভাবেই করা যায় না।’