নিয়ম ভেঙে বিদেশি অনুদান নেওয়ার অভিযোগ ওয়াংচুকের সংস্থার বিরুদ্ধে, তদন্তে সিবিআই

পৃথক রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে অশান্ত লেহ-তে ঝরে গিয়েছে ৪টি প্রাণ। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে লাদাখ। লাদাখে অশান্তির পরের দিনই বৃহস্পতিবার সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সংস্থার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে সিবিআই। লাদাখকে বুধবার অশান্ত করে তোলার জন্য বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে দায়ী করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। সরকারি সূত্রে এদিন জানা গিয়েছে, বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত আইন ‘ফরেন কনট্রিবিউশন অ্যাক্ট’ ভঙ্গ করেছে ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউটঅফ অলটারনেটিভস্ লাদাখ।’ এই সংস্থাটি সোনম ওয়াংচুকের। জানা গিয়েছে, এই সংস্থার বিরুদ্ধে কিছুদিন ধরেই তদন্ত চলছিল। কিন্তু এতদিন কোনও এফআইআর দায়ের না করা হলেও এবার সেই পদক্ষেপ করা হয়েছে।

বুধবার লেহ-তে এই অশান্তির জন্যই সোনম ওয়াংচুককে দায়ী করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সোনম ওয়াংচুকের উস্কানিমূলক মন্তব্যের জন্যই অশান্তির ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ওয়াংচুকের অনশন এবং বক্তৃতা বিক্ষোভকারীদের উসকে দিয়েছিল। তার ফলেই সরকারি অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং ৩০ জনের বেশি পুলিশ এবং সিআরপিএফ কর্মী আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘২৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ অনশন মঞ্চ ছেড়ে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেন ওয়াংচুক। তাতেই বিক্ষোভকারীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে এবং সিইসি লেহ-র সরকারি অফিসে হামলা চালানো হয়।’ কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্ট অভিযোগ, ‘হিংসার মধ্যেই তিনি অনশন ভেঙে অ্যাম্বুল্যান্সে চড়ে গ্রামে ফিরে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কোনও চেষ্টা করেননি।’ প্রসঙ্গত, এই ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়, আহত প্রায় ৮০ জন। রাতভর আটকে রাখা হয় ৫০ জনকে। লাদাখের বিভিন্ন জায়গায় কার্ফু জারি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে বিদেশি অনুদান নিতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ছাড়পত্রও নিতে হয়। সেই শর্ত ভাঙলে এফসিআরএ ধারায় মামলা দায়ের করা হতে পারে। সোনমের সংস্থা ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস লাদাখ’ তথা এইচআইএএল এবং ‘স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অফ লাদাখ’ তথা এসইসিএমওএল-এর বিরুদ্ধে নিয়ম ভেঙে বিদেশি অনুদান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার ওয়াংচুক জানিয়েছেন, প্রায় ১০ দিন আগে সিবিআই-এর তদন্তকারী দল সরকারি নির্দেশনামা নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিল। তিনি বলেন, ‘সিবিআই জানিয়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে এফসিআরএ-র অধীনে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না নিয়ে বিদেশি অনুদান গ্রহণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।’ সোনমের কথায়, ‘আমরা বিদেশি তহবিলের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাই না, তবে আমরা আমাদের জ্ঞান রপ্তানি করি এবং তার বিনিময়ে খরচ সংগ্রহ করি। এই ধরনের তিনটি ক্ষেত্রে, সিবিআই ভেবেছে এটি বিদেশি অনুদান’। সিবিআই তদন্তকারী দল এখনও লাদাখে আছে বলেও বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন সোনম।

তিনি আরও জানান, পরিষেবা চুক্তি মেনে রাষ্ট্রপুঞ্জ, সুইৎজারল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটালির একটি সংস্থাকে তাঁরা ভারতীয় জ্ঞান সরবরাহ করেন। এর আগে লাদাখ অঞ্চলে উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলে যাওয়া ও প্রকৃতির ‘খামখেয়ালিপনার’ জন্য নগরায়ন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকেও দায়ী কয়েছেন পরিবেশকর্মী সোনম। পেয়েছেন ‘জেন জি’র সমর্থন।

সিবিআই আধিকারিকেরা তথ্যের সন্ধানে এইচআইএএল এবং এসইসিএমওএল-এর দপ্তরে গিয়েছিল বলেও জানিয়ে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমাদের কাছে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাদের প্রাপ্ত বিদেশি অনুদানের বিবরণ চাওয়া হয়েছে।’ সোনমের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশে ২০২২-২৪ পর্বে বিদেশি অনুদান নিয়ে তদন্তের কথা বলা হলেও সিবিআই ২০২০ এবং ২০২১ সালের নথি তলব করেছে।

সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। এই দাবিতেই গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি আবার অনশন শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ১৫ জন লাদাখবাসী ৩৫ দিন ধরে অনশনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন ভারতীয় সেনার প্রাক্তন কর্মী। এই আবহে বুধবার দুপুর থেকে বিক্ষোভ শুরু হয় লেহ-তে। বিক্ষোভ-আন্দোলন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী বিক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খায়। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তিতে ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতিতে অনশন ভঙ্গ করেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি সবাইকে শান্তি ফিরিয়ে আনার বার্তা দেন।

প্রসঙ্গত, লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের রাজধানী লেহ-তে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’ নামে স্বাধীন একটি সংগঠন। ঘটনার ঘটার দুই দিন আগেই সংগঠনের নেতারা সতর্ক করেছিলেন যে জনতার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে চলেছে। বুধবার সেটাই ঘটে যায়। কিন্তু হঠাৎ কেন ক্ষেপে উঠল লাদাখ? উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের বিশেষ চরিত্র রক্ষা করাই বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি। আর এই আন্দোলন হঠাৎ করে নয়, গত চার বছর ধরে এই আন্দোলন চলছে। এই নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন তাঁরা। কী কী দাবি রয়েছে তাঁদের?

২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দ্বিখণ্ডিত করার পরে লাদাখকে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। মোদী সরকারের এই পদক্ষেপের পরে, ২০২৪ সালে লাদাখের মানুষ রাস্তায় নামেন চার দফা দাবি নিয়ে। এক- লাদাখকে রাজ্যে পরিণত করা, কারণ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা তাদের স্ব-শাসন এবং সুরক্ষার দাবি পূরণ করেনি। দুই- লাদাখের উপজাতি মর্যাদা রক্ষা করতে ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে এর অন্তর্ভুক্তি, তিন- বেকারত্ব দূর করার জন্য লাদাখের জন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং চার- কেন্দ্রে লাদাখের কণ্ঠস্বর জোরালো করার জন্য লাদাখে দুটি সংসদীয় আসন গঠন করা। বর্তমানে লাদাখে একটি সংসদীয় আসন রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক শুধু শেষ দু’টি দাবি নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। তাদের বক্তব্য, লাদাখ ইতিমধ্যেই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ থাকাকালীন এটাই তাদের দাবি ছিল।

কেন ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হতে চায় লাদাখ? অসম, মেঘালয়, মিজোরাম এবং ত্রিপুরার মতো উপজাতি অধ্যুষিত রাজ্যগুলি ষষ্ঠ তফসিলের আওতাধীন হওয়ায় বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন পায়। স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের হাতে আইনসভা, কার্যনির্বাহী এবং আর্থিক ক্ষমতা, কর সংগ্রহ এবং স্থানীয় সম্পদ পরিচালনা করার মতো ক্ষমতা থাকে। রাজ্যের আইনের বাইরেও আইন তৈরি করার ক্ষমতাও রয়েছে স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের। যদিও এই ক্ষেত্রে রাজ্যপালের অনুমোদন লাগে।

তরুণদের ক্ষোভের মূল কারণ বেকারত্ব এবং সরকারি কাজে নিয়োগে ধীর গতি। তারা পৃথক সার্ভিস কমিশনের দাবি করে আসছে।সাম্প্রতিক এক সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী লাদাখে স্নাতক পাশ করেছে এমন তরুণদের ২৬.৫ শতাংশই কর্মহীন। দেশের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.৪ শতাংশ। সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশের সব রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে বেকারত্বের হার সবথেকে বেশি আন্দামান ও নিকোবরে, ৩৩ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে লাদাখ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে লাদাখবাসীদের আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন সরকারি চাকরিতে লাদাখিদের জন্য ৯৫ শতাংশ সংরক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’-র যুব শাখা বুধবার একটি বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল। অবিলম্বে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকের দাবি জানিয়েছে। কারণ তাদের সদস্যরা ১০ সেপ্টেম্বর থেকে অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ৬ অক্টোবর পরবর্তী আলোচনা হবে।

এদিকে তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে অক্টোবরের বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করায় অসন্তুষ্ট লাদাখবাসী। ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’-র সদস্যদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে একতরফা ‘আদেশ’ জারি করতে পারে না।