ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণায় বিরল এক নজির তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (Defence Research and Development Organisation বা DRDO) পুণে-স্থিত শাখা আর্মামেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট (Armament Research and Development Establishment বা এআরডিই) এবং হায়দরাবাদের বেসরকারি সংস্থা দ্বীপা আর্মার ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড (Dvipa Armour India Private Limited) যৌথভাবে মাত্র একশো দিনে তৈরি করেছে উগ্রম (Ugram) নামের একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্ব পার করে সেই রাইফেল এবার সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (Ministry of Home Affairs) মূল্যায়নে উতরে গিয়েছে, ফলে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে (Central Armed Police Forces বা সিএপিএফ) এই রাইফেল অন্তর্ভুক্তির পথ অনেকটাই প্রশস্ত হল।
কী এই উগ্রম রাইফেল
উগ্রম একটি ৭.৬২ বাই ৫১ মিলিমিটার ক্যালিবারের (calibre) রাইফেল, যা পুরনো আইএনএসএএস (INSAS) রাইফেলের তুলনায় শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে। ওজনে চার কিলোগ্রামেরও কম, কার্যকর পাল্লা প্রায় পাঁচশো মিটার, ম্যাগাজিনে কুড়িটি রাউন্ড ধরে এবং সিঙ্গল ও ফুল অটো, দুই মোডেই গুলি চালানো যায়। সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ কোয়ালিটেটিভ রিকোয়্যারমেন্ট (General Staff Qualitative Requirements বা জিএসকিউআর) মেনে তৈরি এই রাইফেল মূলত জঙ্গি ও নকশাল দমন অভিযানের কথা মাথায় রেখে বানানো হয়েছে। বিএসএফ, সিআরপিএফ, আইটিবিপি, এসএসবি, এনএসজি এবং আসাম রাইফেলসের মতো একাধিক বাহিনীর প্রতিনিধিরা এই রাইফেলের ফায়ারিং, হ্যান্ডলিং ও এরগনমিক্স খতিয়ে দেখেছেন, এবং আমদানি করা সিগ ৭১৬ রাইফেলের সঙ্গে তুলনামূলক পরীক্ষাতেও উগ্রম ভালো ফল করেছে বলে জানা গিয়েছে।
বাংলার সীমান্তে কী প্রভাব
এই খবর পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্যের সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় বাইশশো কিলোমিটার, পড়ে এই রাজ্যেই, যা ছড়িয়ে রয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার, এই ন’টি জেলা জুড়ে। এই বিশাল সীমান্ত পাহারা দেয় সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী (Border Security Force বা বিএসএফ), যারা উগ্রম রাইফেলের অন্যতম প্রধান পরীক্ষক বাহিনী। ফলে সিএপিএফে এই রাইফেল অন্তর্ভুক্তি চূড়ান্ত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলার সীমান্তরক্ষী জওয়ানদের হাতে থাকা অস্ত্রেও।
ইছাপুরের ঐতিহ্য ও আক্ষেপ
এই গোটা প্রকল্পের সঙ্গে একটি বাঙালি আক্ষেপও জড়িয়ে রয়েছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার ইছাপুরে রয়েছে দেশের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রাইফেল কারখানা, রাইফেল ফ্যাক্টরি ইছাপুর (Rifle Factory Ishapore)। ব্রিটিশ আমলে ১৯০৪ সালে স্থাপিত এই কারখানাতেই তৈরি হয়েছিল লি-এনফিল্ড রাইফেল থেকে শুরু করে এসএলআর, ইছাপুর ২এ১ এবং পরবর্তীকালে দেশের নিজস্ব আইএনএসএএস রাইফেল, যা কার্গিল যুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছিল। অথচ উগ্রমের মতো ভবিষ্যতের রাইফেল প্রকল্পের বরাত গিয়েছে হায়দরাবাদের একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে, ইছাপুরের এই ঐতিহাসিক কারখানার হাতে নয়। প্রতিরক্ষা মহলের একাংশের মতে, শতাব্দীপ্রাচীন দক্ষতা ও পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাংলার এই কারখানা নতুন প্রজন্মের রাইফেল প্রকল্পে কেন প্রাধান্য পাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনীতির আঙিনায় প্রতিরক্ষা করিডর বিতর্ক
রাজ্যের বর্তমান বিজেপি সরকারের একাংশ ও দলীয় সমর্থক মহল দাবি করছে, আগের সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মানচিত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যার উদাহরণ হিসেবে তোলা হচ্ছে আইএনএসএএস-এর উত্তরসূরি এ কে-২০৩ রাইফেল প্রকল্প উত্তরপ্রদেশের অমেঠীতে চলে যাওয়ার ঘটনা। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর প্রতিরক্ষা উৎপাদন করিডর হিসেবে বাংলাকে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তবে এই দাবি মূলত রাজনৈতিক ও দলীয় সূত্র থেকে উঠে আসা বক্তব্য, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক নীতিগত ঘোষণা এখনও করেনি। উগ্রম রাইফেলের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি রাজ্য সরকার বদলের অনেক আগে থেকেই হায়দরাবাদ-কেন্দ্রিক হিসেবে এগিয়েছে, ফলে এটিকে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখাটা যুক্তিসঙ্গত নয়।
আগামী দিনের ছবি
সেনা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার পর এখন উগ্রম রাইফেলের সামনে বাকি রয়েছে চূড়ান্ত ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যাপক উৎপাদনের ধাপ। প্রতিরক্ষা মহলের মতে, দেশীয় অস্ত্র উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত এমন একটা সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে একাধিক সংঘাতের জেরে অস্ত্র আমদানিতে জটিলতা বাড়ছে। বাংলার প্রেক্ষিতে অবশ্য আসল প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সীমান্তরক্ষী জওয়ানদের হাতে নতুন অস্ত্র পৌঁছনোর পাশাপাশি কবে ইছাপুরের মতো ঐতিহাসিক কারখানাও এই নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পারবে।