লোকসভায় পাশ ‘রূপান্তরকামী অধিকার সুরক্ষা বিল’

প্রবল বিরোধিতা এবং বিতর্কের আবহেই লোকসভায় পাস হয়ে গেল রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল ২০২৬। সংশোধিত এই বিলে রূপান্তরকামী পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা নিয়েই শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা।

নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি আর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী হিসেবে ঘোষণা করতে পারবেন না। এই পরিচয় পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে একটি মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে এই শংসাপত্র প্রদান করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দল এবং বিভিন্ন সংগঠন। এই ইস্যুকেই কেন্দ্র করে সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত ধ্বনি ভোটে বিলটি পাস হয়ে যায়।

তবে এখনই এটি আইন হিসেবে কার্যকর হচ্ছে না। বিলটি কার্যকর করতে হলে প্রথমে রাজ্যসভায় পাস হতে হবে এবং তার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন। বিলটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সরব হয়েছে একাধিক ট্রান্সজেন্ডার সংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাদের দাবি, এই সংশোধনী আত্মপরিচয়ের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করছে এবং রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের অধিকার সংকুচিত করছে। তাদের মতে, লিঙ্গ স্বীকৃতির প্রক্রিয়াকে সহজ করার বদলে এটি আরও জটিল করে তুলবে এবং মৌলিক অধিকার খর্ব করবে।


অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার এই বিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার জানান, এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হল প্রকৃত রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাবে ভুয়ো দাবির সংখ্যা বেড়েছে, যার ফলে প্রকৃত উপভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এছাড়া, বিলে শাস্তির বিধানও কঠোর করা হয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর থেকে বাড়িয়ে ১৪ বছর কারাদণ্ড করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে, বিলটি পাস হলেও তা ঘিরে বিতর্ক এখনও তুঙ্গে, এবং আগামী দিনে রাজ্যসভায় এই নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ জুন মালিয়া অভিযোগ করেন, এই সংশোধনী বিলটি ট্রান্সজেন্ডারদের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে এবং এটি সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পরিপন্থী। তাঁর কথায়, ‘কেউ কে সে তা জানাতে রাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।‘ এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের উদাহরণ তুলে ধরে বিলটিকে স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোরও দাবি জানান জুন।

তৃণমূল সাংসদ অভিযোগ করেছেন, ‘বিলটির মাধ্যমে স্ব-পরিচয়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালের একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ট্রান্সজেন্ডারদের স্ব-পরিচয়ের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে সেই অধিকার বাতিল করে মেডিক্যাল বোর্ডের মাধ্যমে পরিচয় নির্ধারণের ব্যবস্থা আনা হয়েছে, যা অন্যায়।‘

একই সঙ্গে জুন বলেন, বিলের মেডিক্যাল সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ব্যক্তিগত মর্যাদা, গোপনীয়তা ও শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের বিরোধী। সংশোধিত আইনে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দের সংজ্ঞাও সীমিত করা হয়েছে এবং অস্পষ্ট ফৌজদারি ধারার অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে বলেও সরব হয়েছেন তিনি।