লোকসভার (Lok Sabha) দলত্যাগ-বিরোধী আইন নিয়ে যে টানাপড়েন গত কয়েক মাস ধরে সংসদের অলিন্দে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা এবার নির্দিষ্ট বাঁকে এসে দাঁড়াল। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ২০ জন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদকে মাত্র সাত দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার নোটিস পাঠাল লোকসভা সচিবালয় (Lok Sabha Secretariat)। ২৫ অগস্ট তারিখের এই নোটিসে সাংসদদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, দলত্যাগ-বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে যে ডিসকোয়ালিফিকেশন বা অযোগ্যতার মামলা রুজু হয়েছে, তার জবাবে তাঁরা কী বলতে চান।
সুপ্রিম কোর্টের চাপ
ঘটনার শুরু আরও আগে। তৃণমূলের লোকসভা দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত ১৮ জুন এই ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক আবেদন জমা দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) কাছে। অভিযোগ ছিল, দলীয় প্রতীকে জিতে সাংসদ হওয়ার পরেও তাঁরা দল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন কার্যত অস্তিত্বহীন একটি রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (NCPI)। সংবিধানের দশম তপশিল (Tenth Schedule) অনুযায়ী তাঁদের এই কার্যকলাপ সরাসরি অযোগ্যতার আওতায় পড়ে বলে দাবি করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
কিন্তু নির্দিষ্ট তিন মাসের সময়সীমা কেটে গেলেও স্পিকারের দপ্তর থেকে কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। যার জেরে অভিষেক সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থ হন এবং সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় আবেদন জানিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের আর্জি জানান। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ সেই আবেদন গ্রহণ করে। শুনানিতে বিচারপতি বাগচি স্পষ্ট করে দেন, নোটিস জারি করাটাই আসল প্রশ্ন নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া শেষ করাই আসল বিষয়। এর ঠিক পরদিনই লোকসভা সচিবালয় থেকে জারি হয় সাত দিনের নোটিস, যা রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই যোগসূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>Cover up caught out! We <a href=”https://x.com/AITCofficial?ref_src=twsrc%5Etfw”>@AITCofficial</a> filed 20 disqualification petitions on June 19. Speaker LS did nothing except give them better seats at our expense. SG Tushar Mehta in Court said Speaker had issued notices. Notice dated Aug 25th – exact date of hearing! <a href=”https://t.co/ZGBo2egbAk”>pic.twitter.com/ZGBo2egbAk</a></p>— Mahua Moitra (@MahuaMoitra) <a href=”https://x.com/MahuaMoitra/status/2092478604877918598?ref_src=twsrc%5Etfw”>August 26, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
কারা রয়েছেন
দলত্যাগ-বিরোধী আইন সংক্রান্ত নিয়মের (Rule 6 of the Members of Lok Sabha Disqualification Rules, 1985) আওতায় জারি হওয়া এই নোটিস পেয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিক, অরূপ চক্রবর্তী, দেব (দীপক অধিকারী), সায়নী ঘোষ, বাপি হালদার, আবু তাহের খান, অসিত কুমার মাল, জুন মালিয়া, মিতালি বাগ, খলিলুর রহমান, মালা রায়, শর্মিলা সরকার এবং ইউসুফ পাঠান। উল্লেখ্য, ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদ এভাবে দল ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা তৃণমূলের সাংগঠনিক ইতিহাসে তো বটেই ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসেও নজিরবিহীন।
বিদ্রোহের শিকড়
গত জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) তৃণমূলের ভরাডুবির পরপরই এই অন্তর্দলীয় অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে। ২০ জন সাংসদ ঘোষণা করেন, তাঁরা এনসিপিআই-এর (NCPI) সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে (NDA) সমর্থন জানাবেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদ একসঙ্গে অন্য দলে সংযুক্ত হলে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতা থেকে রেহাই মেলে। এরপর থেকে সংসদে তাঁদের আলাদা আসন বরাদ্দ হয়েছে এবং তাঁরা এনডিএ-র কার্যকলাপেও অংশ নিচ্ছেন, যদিও লোকসভার খাতায় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা তৃণমূলেরই সদস্য বলে চিহ্নিত, কারণ এনসিপিআই-এ সংযুক্তির আবেদন এখনও বিচারাধীন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি
এই মামলার নিষ্পত্তি রাজ্যের রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যদি স্পিকার শেষ পর্যন্ত এই ২০ জনকে অযোগ্য ঘোষণা করেন, তবে লোকসভায় তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি একধাক্কায় কমে যাবে এবং ওই আসনগুলিতে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা রাজ্য বিধানসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়া তৃণমূলের কাছে আরও একটি কঠিন লড়াই। উল্টোদিকে, যদি সাত দিনের জবাবের পরেও প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিরোধীরা আরও একবার সরব হবে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। কারণ সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ থেকেই স্পষ্ট, বিলম্বই এখন এই মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূল শিবিরের অন্দরের বার্তা স্পষ্ট, দলের প্রতীকে জিতে অন্য শিবিরে চলে যাওয়াকে তারা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই দেখছে, এবং এই লড়াইকে তারা শুধু সংসদীয় কৌশল নয়, দলের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে।