সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছে এই বাজেট

অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন রবিবার সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেছেন। এটি তাঁর টানা নবম বাজেট, যা একদিকে ব্যক্তিগত রেকর্ড, অন্যদিকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন। সরকার এই বাজেটকে ভবিষ্যৎমুখী ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরলেও, বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এতে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রশ্নটিকে  উপেক্ষা করা হয়েছে।
ম্যাক্রো অর্থনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে বাজেটটি সংযত ও নিয়ন্ত্রণমূলক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রাজকোষের ঘাটতি জিডিপির ৪.৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে প্রবৃদ্ধির পথেই এগোনোই এই বাজেটের মূল দর্শন। ঋণনির্ভর ব্যয়ের বদলে নিয়ন্ত্রিত ঘাটতি ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এই সংযমী অবস্থান অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিকে কিছুটা সীমিত রাখতে পারে।
এই বাজেটে মূলত জোর দেওয়া হয়েছে পরিকাঠামো ও মূলধন ব্যয়ের উপর। প্রায় ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা মূলধন ব্যয় বরাদ্দ করে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সড়ক, রেল, বন্দর ও জলপথই আগামী দিনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির চালিকাশক্তি। ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোর, নতুন জাতীয় জলপথ এবং দ্রুতগামী রেল করিডোরের মতো প্রকল্পগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই ব্যয়ের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছতে সময় লাগবে— এই বাস্তব অবস্থাটি অস্বীকার করা যাবে না।
উৎপাদন ও শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও বাজেটটি পূর্ব নীতিরই সম্প্রসারণ। বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স এবং বিশেষ রাসায়নিক শিল্পে নতুন প্রণোদনার ঘোষণা করা হয়েছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের অবস্থান জোরদার করাই এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য। যদিও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের তাৎক্ষণিক আর্থিক সঙ্কট বা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রশ্নে বাজেটটি তুলনামূলকভাবে নীরব।
কর কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ব্যক্তিগত আয়করের হার প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মত অনেকের। পাশাপাশি সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্সে পরিবর্তনের জেরে শেয়ার বাজারে বাজেট-পরবর্তী প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নেতিবাচক।রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় বাজেট ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেটে মাত্র তিনটি ঘোষণার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গকে ফের বঞ্চনা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির প্রতি কেন্দ্রের বৈষম্যমূলক মনোভাব এই বাজেটেও স্পষ্ট। রাজ্যের বকেয়া, প্রকল্প অনুমোদন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিগুলি উপেক্ষিত রয়ে গেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। বিরোধী দলগুলির মতে, এই বাজেট সামাজিক ন্যায় ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে ব্যর্থ।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত প্রবৃদ্ধির একটি নকশা পেশ করেছে। তবে সেই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে পারবে কি না এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি আনবে— তার উত্তর মিলবে এর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই। তবে এই মুহূর্তে এই বাজেট সাধারণ মানুষের মনে তেমন কোনও আশা জাগাতে পারেনি।