নেতাজির চিতাভস্ম দেশে ফেরানোর দাবি একাধিকবার করা হয়েছে ভারত সরকারের কাছে। অনিতা পাফ গত বছরই ভারত সরকারের কাছে চিঠি লিখে আবেদন করেছিলেন যাতে জাপানের রেনকোজি মন্দিরের চিতাভস্ম দেশে ফেরানো যায়। ওই চিতাভস্ম নেতাজির বলে দাবি ছিল তাঁর। সেই একই দাবিতে সরব হয়ে বসু পরিবারের আরেক সদস্য চন্দ্র বসু সদ্য রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে আবেদন করেছেন, এবার ২৩ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৯তম জন্মদিনের আগেই যাতে রেনকোজি মন্দিরে রাখা ‘নেতাজির চিতাভস্ম’ ফেরানোর ব্যবস্থা করা হোক। সেই খবর সামনে আসতেই ‘প্রমাণিত সত্য’ হিসাবে তাইওয়ান রিপোর্টের কপি রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠিয়েছেন দুই গবেষক সৈকত নিয়োগী এবং সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও সেই রিপোর্ট পাঠিয়েছেন তাঁরা।
এই রিপোর্ট ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এনেছেন এই রাজ্যেরই দুই গবেষক সৈকত এবং সৌম্যব্রত। তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু দূরের কথা, ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট সেখানে কোনও বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি বলে এই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। সেই রিপোর্টই রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছেন তাঁরা।
কলকাতায় এই রিপোর্ট নিয়ে দুই গবেষকের আলোচনা হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা, শরৎচন্দ্র বসুর নাতি চন্দ্র বসুর সঙ্গে। প্রাক্তন এই বিজেপি নেতা চন্দ্র বসুর দাবি, রেনকোজির চিতাভস্ম সুভাষচন্দ্রেরই। সৈকত ও সৌম্যর সঙ্গে আলোচনায় কয়েক মাস আগে একাধিক তত্ত্ব তুলে ধরে এই দাবি করেন চন্দ্র বসু। তিনি বলেন, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর ‘প্রামাণ্য নথি’ রয়েছে।
পাল্টা তাইওয়ান রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেন সৌম্য ও সৈকত। তাঁদের দাবি, যে দেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়, ব্রিটিশ সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে তৈরি সেই দেশেরই গোয়েন্দা রিপোর্ট জানিয়েছে, ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট তারিখে কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি।
১৯৫৬ সালের এই রিপোর্ট এতদিন পর্যন্ত ভারত সরকার উদ্ধারে সচেষ্ট না হলেও ব্রিটিশ সরকারের আর্কাইভে তা এতদিন ধরে সংরক্ষিত ছিল। সেই রিপোর্টই উদ্ধার করে আনেন কলকাতার দুই গবেষক। তাইওয়ান রিপোর্টটি দেখতে চেয়েছিলেন চন্দ্র বসু। সেটি তাঁকে পাঠানোও হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এই দুই গবেষক। কিন্তু এর পরে জানা যায়, চন্দ্র বসু রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তাঁর পুরনো দাবিই জারি রেখেছেন।
সৈকত নিয়োগী এক সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির দপ্তরে আসল সত্যিটা জানাতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। তাঁর কথায়, ‘নেতাজিকে নিয়ে ভুল দাবির ভিত্তিতে অন্য কারও চিতাভস্ম এনে নেতাজির বলে চালানোর ষড়যন্ত্র চলছে। অথচ সামনেই রয়েছে তাইওয়ান রিপোর্ট। তা নিয়ে কারও কোনও হেলদোল নেই।’
অপর গবেষক সৌম্যব্রত দাশগুপ্তর কথায়, ‘নেতাজিকে নিয়ে কোনও তথ্য বা তত্ত্ব না পাওয়া গেলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু যেখানে প্রমাণিত তথ্য সকলের সামনে রয়েছে, সেখানে মিথ্যা দাবি নিয়ে মাতামাতি, কিংবা ষড়যন্ত্র চলবে, আর আমরা বসে বসে দেখব, এটা হতে পারে না।’
তাইওয়ান সরকারের দেওয়া ৭০ পাতার এই একমাত্র প্রামাণ্য রিপোর্ট রয়েছে সৌম্য এবং সৈকতের কাছেই। সৌম্য প্রথম এই রিপোর্টের উল্লেখ নজর করেন মানিকতলার পুলিশ মিউজিয়ামে। কিন্তু রিপোর্টের হদিশ তখন মেলেনি। সৈকত তখন ছিলেন লন্ডনে। সৌম্যর কাছে সূত্র পেয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে খোঁজ করে সৈকত সেটি উদ্ধার করেন। এর উপর ভিত্তি করে সৈকত লিখেছেন ‘নেতাজি তদন্ত রিপোর্ট’ নামে গবেষণাধর্মী একটি বইও।
তাইওয়ান রিপোর্টের ভিত্তিতে জাস্টিস মনোজ মুখার্জি কমিশনও তাদের রিপোর্টে জানায়, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। এটি খারিজ করে দেয় কংগ্রেস সরকার। কেন্দ্র সরকার জানিয়ে দেয়, ‘তাইওয়ান সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের সরাসরি কোনও যোগাযোগ নেই। তাই সেই সরকারের কোনও রিপোর্ট আনা যাবে না।’ এরপর আর কোনও সরকারের আমলে সেই রিপোর্ট সংসদে দ্বিতীয়বার পেশ করতে দেওয়া হয়নি।