সৈয়দ হাসমত জালাল
গত কয়েকবছর ধরে এনআরসি দেশে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। এই এনআরসি সম্পর্কে বহু মানুষেরই এখনও স্বচ্ছ ধারণা নেই। এনআরসি-র পুরো কথা, ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস। বাংলায় এর অর্থ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি। এটি আসলে একটি সরকারি তালিকা, যাতে ভারতের নাগরিকদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। এদেশে অসমে ২০১৯ সালে এনআরসি-র তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। এই এনআরসি-র পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল মুখ্য, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিজেপি শাসিত অসম সরকারের দাবি, এই রাজ্যে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করেন। তাঁদের বহিষ্কৃত করার জন্যই এনআরসি-র প্রয়োজন, এরকম দাবি ছিল অসমের বিজেপি সরকারের। কিন্তু এনআরসি-র তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা যায়, চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। প্রকৃত সংখ্যাটি হল, ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। অর্থাৎ এনআরসি মতে, ওই ১৯ লক্ষ মানুষ ভারতের নাগরিক নন। কিন্তু দেখা গেল, ওই ১৯ লক্ষের মধ্যে প্রায় ১৪ লক্ষ বাঙালি হিন্দু। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে তার প্রতিকূল প্রভাব পড়বে বলে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় সরকার।
এই এনআরসি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেখানে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যরাও চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে যেমন ছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবার, তেমনি ছিলেন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিক থেকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, এমনকি বিজেপির এমএলএ এবং এমপি পরিবারের সদস্যরাও। এঁদের সবাইকেই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের কথা না হয়, বাদই দেওয়া গেল। মনে রাখা দরকার, অসমে প্রায় প্রতিবছরই ভয়াবহ বন্যার প্রকোপ ঘটে। তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি চলে যায় জলের তলায়। সেখানে কোনও নথিপত্র বাঁচানো তো দূরের কথা, মানুষের প্রাণ বাঁচানো দুরূহ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষেরা কীভাবে ৭০-৮০ বছর আগের প্রমাণপত্র দেখাবেন। এদিকে এই এনআরসি থেকে কেন ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হল, তা এনআরসি কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে এই এনআরসি থেকে বাদ যাওয়া নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষ।
যদিও এই এনআরসি শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি, কিন্তু এর থেকে একটি সত্য প্রকাশ্যে এলো, বিজেপি ও অন্যান্য উগ্র জাতীয়তাবাদী দল অসমে এক কোটিরও বেশি বিদেশি রয়েছেন বলে যে প্রচার চালিয়েছিল, তা ছিল চূড়ান্ত ভিত্তিহীন। কিন্তু এই সুযোগে প্রায় তিন-চার হাজার বাঙালিকে ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁরা মনুষ্যেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। উল্লেখ্য, অসমের গোয়ালপাড়ায় দেশের সবচেয়ে বড় একটি বন্দিশিবির তৈরি করা হয়েছে।
ইদানিং বিজেপি শাসিত সমস্ত রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি হিসেবে তকমা দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা ছাড়াও ঝাড়খন্ড, বিহার ও দিল্লিতে ভারতীয় বাঙালির সংখ্যা কম নয়। আপাতত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে অনেককে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু মানুষ অবশ্য নিজের দেশ ভারতে ফিরতে পেরেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, শ্রমিকদের পর এবার বিজেপির লক্ষ্য হয়ে উঠবে সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি সমাজ? অসমে এনআরসি বাতিল হলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তখনই ঘোষণা করেছিলেন যে, সারা দেশে এনআরসি করা হবে। লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন বাঙালিরাই। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কথা ছেড়েই দেওয়া যায়, শহরের শিক্ষিত মানুষেরাও কতজন তাঁদের পিতার জন্মের শংসাপত্র (বার্থ সার্টিফিকেট) বা অন্যান্য নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখাতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
সামনের ২০২৬ সালেই পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে হবে বিধানসভা নির্বাচন। আর তাই ভোটব্যাঙ্কে মেরুকরণ ঘটাতে এনআরসি নিয়ে হৈচৈ শুরু করেছে বিজেপি ও তাদের সমর্থক উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলি। তাদের মূল লক্ষ্য, বাঙালিকে সঙ্কটে ফেলে সমর্থন আদায় করা। সম্প্রতি অসমের মুখ্যমন্ত্রী সে রাজ্যে জনগণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, যাঁরা নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা বলেন, তাঁরা ‘বাংলাদেশি’। অথচ অসমে প্রায় এক কোটি বাঙালি বসবাস করেন। তাই অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে যে বাঙালি শ্রমিকেরা রয়েছেন, তাঁদের যে নির্মমভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, তা বৃহত্তর বাঙালির মধ্যে সচেতনতা তৈরির পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু এখনও মুষ্টিমেয় দু-একটি সংগঠন ছাড়া বৃহত্তর বাঙালি সমাজে সেভাবে এর প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না। আর সে কারণেই এবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ইস্যুতে পথে নামছেন। দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির এই বিষয়ে একজোট হওয়া দরকার। তা না হলে বাঙালির সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে।