তাজমহল কি আদতে শিবমন্দির? হাইকোর্টের প্রশ্নে জমাট বিতর্ক, জবাব দেবে ASI

তাজমহল কি মন্দির? (প্রতীকী ছবি-AI)

তাজমহল (Taj Mahal) কি সত্যিই একদা ছিল তেজো মহালয়া নামের এক শিবমন্দির? বহু পুরনো এই প্রশ্ন নতুন করে উসকে দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট (Allahabad High Court)। বিচারপতি রোহিত রঞ্জন আগরওয়ালের (Justice Rohit Ranjan Agarwal) বেঞ্চ সোমবার কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগকে (Archaeological Survey of India, ASI) নোটিস পাঠিয়ে এ বিষয়ে জবাব তলব করেছে। তাজমহল পরিদর্শন ও ছবি তোলার আবেদন নিয়ে চলা এক মামলার প্রেক্ষিতেই এই নির্দেশ।

মামলার শিকড় কোথায়

বিতর্কের সূত্রপাত ২০১৫ সালে, আগ্রার এক দেওয়ানি আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলায়। আইনজীবী হরি শঙ্কর জৈনের (Hari Shankar Jain) মাধ্যমে ভগবান শ্রী অগ্রেশ্বর মহাদেব নাগনাথেশ্বর বিরাজমান তেজো মহালয়া মন্দিরের নামে দায়ের হওয়া সেই মামলায় দাবি করা হয়, তাজমহল আসলে ছিল ভগবান শিবের উদ্দেশে নিবেদিত একটি হিন্দু মন্দির, নাম তেজো মহালয়া। আবেদনকারীদের দাবি অনুযায়ী, রাজা পরমার্দি দেব ১১৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির তৈরি করেছিলেন, যদিও কোনও কোনও প্রতিবেদনে সালটি বলা হয়েছে ১২১২ খ্রিস্টাব্দ। পরে তা রাজা মান সিংহ এবং জয়পুরের রাজা জয় সিংহের অধীনে আসে, এবং শেষমেশ মুঘল সম্রাট শাহজাহান তা দখল করে মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধে রূপান্তরিত করেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।


আদালতে লড়াই কীসের

মূল মামলা চলাকালীন ২০১৭ সালে আবেদনকারীরা আদালতের কাছে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আর্জি জানান, যিনি তাজমহল পরিদর্শন করে ছবি ও ভিডিয়ো তুলে আদালতে রিপোর্ট জমা দেবেন। বিচারিক আদালত ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সেই আবেদন খারিজ করে দেয়, এই যুক্তিতে যে কমিশনার নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়নি। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজও সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেন। এর পরই আবেদনকারীরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন, দাবি করেন নিম্ন আদালত দুটি বিষয়টির মূল দিক খতিয়ে না দেখেই আবেদন খারিজ করেছে।

পিটিশনে যুক্তি কী

আবেদনে বলা হয়েছে, মার্বেল গম্বুজের চূড়ায় থাকা কলস, গম্বুজ ঘিরে পদ্মফুলের নকশা, এবং চত্বরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এএসআই-এর নথিতে গোশালা হিসেবে চিহ্নিত একটি কাঠামো, এই সবকিছু মিলিয়ে অন্তত ১০৯টি স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি আবেদনকারীদের, যা প্রমাণ করে কাঠামোটি আদতে হিন্দু মন্দির। এমনকী এএসআই প্রতি শুক্রবার নমাজের অনুমতি দিলেও হিন্দু উপাসনায় বাধা দেয় এবং স্মৃতিসৌধের একাধিক তলা তালাবন্ধ রাখে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে আবেদনে। আবেদনকারীদের যুক্তি, সংরক্ষিত এই স্মৃতিসৌধে স্বাধীনভাবে ছবি তোলার অধিকার তাঁদের নেই, তাই কাঠামোর স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করতে হলে আদালত নিযুক্ত কমিশনারের মাধ্যমে ছবি তোলা জরুরি।

ইতিহাস ও আদালতের পুরনো রায়

তাজমহল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মূলধারার বয়ান বলছে, সম্রাট শাহজাহানের হাতে এই স্মৃতিসৌধের নির্মাণ শুরু হয় ১৬৩১ সালে এবং তা সম্পূর্ণ হয় ১৬৪৮ সালে, যার প্রমাণ পিটার মুন্ডি ও জঁ-বাপ্তিস্ত তাভের্নিয়ের মতো সমসাময়িক ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণেও পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে এএসআই সংসদে জানিয়েছিল, তাজমহল কোনও মন্দির ছিল এমন কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই। তেজো মহালয়া তত্ত্বের মূল উৎস ছিলেন লেখক পিএন ওক (P.N. Oak), যাঁর দাবি ২০০০ সালে খারিজ করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৫ সালে প্রায় একই ধরনের একটি আবেদন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল রাজা পরমার্দি ১১৯৬ সালে তাজমহল তৈরি করেছিলেন, তাও খারিজ করে দিয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। বর্তমান মামলাটি অবশ্য পুরোপুরি নতুন একটি সিভিল স্যুট, তাই আদালতের আগের পর্যবেক্ষণ এই মামলার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে যোগসূত্র

তাজমহল মামলা বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। বারাণসীর জ্ঞানবাপি মসজিদ (Gyanvapi Mosque), মথুরার শাহী ইদগাহ (Shahi Idgah, Krishna Janmabhoomi বিতর্ক), এবং মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা-কমাল মাওলা কমপ্লেক্স (Bhojshala-Kamal Maula complex), এই সব ক’টি ক্ষেত্রেই একই ধরনের ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত মামলা চলছে বা সদ্য নিষ্পত্তি হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ভোজশালাকে দেবী সরস্বতীর মন্দির বলে ঘোষণা করে। ২০০৩ সালের এএসআই-এর নিয়ম খারিজ করে দেওয়া হয়, যাতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট দিনে উপাসনার ব্যবস্থা ছিল। সেই রায়ের বিরুদ্ধে মুসলিম পক্ষ ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে। অর্থাৎ দেশজুড়ে সুরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আইনি লড়াই একটি নতুন এবং ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হয়ে উঠছে, যার সাম্প্রতিকতম সংযোজন তাজমহল।

বাংলাও বাদ নেই

এই জাতীয় প্রবণতার প্রতিধ্বনি অবশ্য পশ্চিমবঙ্গেও অচেনা নয়। কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ে লাগোয়া ১৩৬ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদ সরানোর প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক চলছে। মুর্শিদাবাদে প্রস্তাবিত একটি স্থাপনার নামকরণ নিয়েও বলা হয়েছে, বিজেপি সরকার বাবরের নাম বাংলা থেকে মুছে দেওয়া হবে। তাজমহল মামলার সঙ্গে এই ঘটনাগুলির সরাসরি কোনও আইনি যোগ নেই, তবে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও উপাসনাস্থলের ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা সারা দেশে জোরালো হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গও যে তার বাইরে নয়, তা স্পষ্ট।