ট্রাফিক চালানের জরিমানা মেটাননি? এবার সেই বকেয়া জুড়ে যেতে পারে আপনার বিদ্যুতের বিলেও। আর বিল না মেটালে কেটে যেতে পারে লাইন। সোমবারের শুনানিতে এমনই অভিনব পরামর্শ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। তবে এটি এখনও নির্দেশ নয়, নিছকই পরামর্শ।
ঠিক কী বলল শীর্ষ আদালত?
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে একটি দীর্ঘদিনের জনস্বার্থ মামলার শুনানি চলছিল। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা (Justice JB Pardiwala) ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথন (Justice KV Viswanathan)।
বিচারপতি পারদিওয়ালার প্রশ্ন, শুধু ই-চালান (e-challan) কেটে গেলেই কি কাজ শেষ? তাঁর মতে, পুলিশ হাজার হাজার, লাখ লাখ চালান কাটতেই পারে। আসল প্রশ্ন জরিমানা আদায়ের। টাকা না এলে সব চালানই কাগুজে।
সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, যাঁরা চালান মেটাচ্ছেন না, তাঁদের বকেয়া বিদ্যুতের বিলে জুড়ে দেওয়া হোক। বিল না দিলে লাইন কাটা পড়বে, কাজেই বাধ্য হয়েই টাকা দেবেন। এ দেশে উপায় বার করে নিতে হয়, এমন মন্তব্যও করেছে বেঞ্চ।
৪৫ হাজার কোটি বকেয়া, আদায় কত?
শুনানিতে জানানো হয়, রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে ই-চালান বাবদ মোট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এখনও পর্যন্ত আদায় হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি। অর্থাৎ বকেয়া থাকছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
মামলাটি শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। কোয়েম্বাটোরের অস্থিরোগ চিকিৎসক এস রাজাশেখরন (S Rajaseekaran) সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন। তারই অংশ হিসেবে মোটর ভেহিক্যালস আইনের (Motor Vehicles Act) ধারা ১৩৬এ (Section 136A) এবং কেন্দ্রীয় মোটর ভেহিক্যালস বিধির ১৬৭এ নিয়মে ইলেকট্রনিক নজরদারি কার্যকর করার আর্জি এখন শুনছে আদালত।
আর কী কী কড়াকড়ি?
বিদ্যুৎ বিলের প্রস্তাবটাই শিরোনামে এসেছে। কিন্তু বেঞ্চ আরও কয়েকটি উপায়ের কথা বলেছে।
বকেয়া চালান আছে, এমন গাড়ি পরিবহন পোর্টালে (Parivahan portal) কালো তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে। তাতে গাড়ির মালিকানা বদলও আটকে যাবে। রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (Registration Certificate) নবীকরণ হবে না। ফিটনেস সার্টিফিকেট (Fitness Certificate), পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট (PUC) এবং ডুপ্লিকেট কাগজও মিলবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স (Driving Licence) স্থগিতের কথাও উঠেছে।
রাস্তায় আচমকা তল্লাশি চালিয়ে বকেয়া চালানওয়ালা গাড়ি আটক (impound) করার পরামর্শও এসেছে। আদালত এটাও মনে করিয়েছে, ই-চালান সাধারণত সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে হাজির হয়ে জরিমানা মেটানোর সুযোগ থাকে।
অন্য রাজ্যে কী হচ্ছে?
বকেয়া চালান নিয়ে মাথাব্যথা সারা দেশেই। চণ্ডীগড় প্রশাসন আগেই ঠিক করেছিল, পাঁচটি বা তার বেশি চালান বকেয়া থাকলে ১৫ দিনের নোটিস দেওয়া হবে। তাতেও টাকা না মেটালে লাইসেন্স বাতিল ও গাড়ির আরসি বাজেয়াপ্ত হবে। উল্লেখ্য, চণ্ডীগড়েই একজন বারবার আইনভঙ্গকারী ২৬৯টি অপরাধে ধরা পড়ায় ৫৩৮০০ টাকা জরিমানার পাশাপাশি ১৫ দিন কমিউনিটি সার্ভিসের শাস্তিও পেয়েছেন।
আবার খানিকটা নরম পথেও হাঁটছে কেউ কেউ। গত বছর বেঙ্গালুরুতে বকেয়া চালানে ৫০ শতাংশ ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিনেই আদায় হয়েছিল ৪ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা।
আইনের জটে আটকে যাবে?
কাগজে কলমে পরামর্শটা চমকপ্রদ। বাস্তবে প্রশ্ন অনেক।
বিদ্যুৎ পরিষেবা চলে বিদ্যুৎ আইন (Electricity Act) মেনে। ট্রাফিক জরিমানা পড়ে মোটর ভেহিক্যালস আইনের এক্তিয়ারে। দুই আইনের এই মিলমিশ বা সমন্বয় আনতে রাজ্যগুলিকে আলাদা নিয়ম বা আইনি ব্যবস্থা করতে হতে পারে। বিদ্যুৎ সংস্থা কি তাহলে ট্র্যাফিক জরিমানা আদায়ের এজেন্ট হবে, সেটাও পরিষ্কার নয়।
আরও একটি জট আছে। গাড়ির মালিক আর বিদ্যুতের গ্রাহক, সব ক্ষেত্রে একই মানুষ নাও হতে পারেন। ভাড়াবাড়ি বা যৌথ পরিবারে কার চালানের বোঝা কার বিলে চাপবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। চালান ভুল বলে আপত্তি থাকলে, সেই বিবাদ না মিটলেও কি লাইন কাটা যাবে? এই প্রশ্নেরও জবাব মেলেনি।
তাই এখনই আতঙ্কের কারণ নেই। আদালত নিজেই বলেছে, এটি নির্দেশ নয়, ভেবে দেখার পরামর্শ। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার।
বাংলার কী হবে?
আগে দেখে নিন, আপনার গাড়ির নামে কোনও বকেয়া চালান আছে কি না। পরিবহন পোর্টালের ই-চালান পাতায় গাড়ির নম্বর দিয়ে তা জানা যায়। রাজ্যের সংযোগ (Sanjog) পোর্টালেও কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ, রাজ্য ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন দপ্তরের বকেয়া চালানের তথ্য মেলে। সেখানেই অনলাইনে জরিমানা মেটানো যায়।
বিদ্যুতের বিলে জরিমানা জোড়ার ব্যবস্থা চালু হোক বা না হোক, বকেয়া চালান পুরনো গাড়ি বিক্রি, আরসি নবীকরণ বা ফিটনেসের সময় ঠিকই ঝামেলা বাধাবে। তাই সময় থাকতে বাকির হিসেব মিটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ।