গণতান্ত্রিক নির্বাচনে স্বচ্ছতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India-ECI) কী করে ভোট গণনার যাবতীয় সরকারি ভিডিও রেকর্ড হারিয়ে ফেলতে পারে, তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলল দেশের শীর্ষ আদালত। ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের একটি বিতর্কিত কেন্দ্রের ভোট গণনার ভিডিও ফুটেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে কমিশনের তরফে আদালতে সওয়াল করা মাত্রই ক্ষোভে ফেটে পড়ল বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবার ডিভিশন বেঞ্চ। কমিশনের আইনজীবীকে রীতিমতো ভর্ৎসনা করে আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন যুক্তিহীন ও বাজে অজুহাত (lame excuses) বরদাস্ত করা হবে না। হাতে যা নথি রয়েছে, আগামী শুনানিতে তা পেশ না করলে কমিশনের বিরুদ্ধেই কড়া পদক্ষেপের করতে বাধ্য হবে আদালত।
দায়িত্ববোধ নিয়ে তীব্র ভর্ৎসনা
বুধবার শুনানির শুরুতেই নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী প্রবীণ অ্যাডভোকেট শেষাদ্রি নায়ডু আদালতে দাবি করেন, ২০২৩ সালে কর্ণাটকের ওই নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোট গণনার কোনও ভিডিও রেকর্ডিং আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বক্তব্য শোনার পরেই স্তম্ভিত হয়ে যায় সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতিরা সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন করাই যে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ, তারা কীভাবে নিজেদের হেফাজত থেকে এমন সংবেদনশীল রেকর্ড হারিয়ে ফেলতে পারে?
আদালতের তীব্র মন্তব্য, যেখানে প্রতিটি বুথ এবং গণনা কেন্দ্রের সব ধরনের তথ্য সযত্নে নথিবদ্ধ রাখার কথা, সেখানে কমিশন কীভাবে আদালতে দাঁড়িয়ে বলতে পারে যে তারা ফুটেজ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে? বিচারপতিদের নির্দেশ, আগামী শুনানির দিনে কমিশনের কাছে যা কিছু তথ্য মজুত রয়েছে, তা আদালতে জমা দিতে হবে। তা না হলে শীর্ষ আদালত ধরে নেবে যে কমিশন ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপন করছে এবং সেই অনুযায়ী কমিশনের বিপক্ষেই চরম বিরূপ সিদ্ধান্ত (adverse inference) গ্রহণ করা হবে।
পুনর্গণনার জটিল লড়াই
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কর্ণাটকের শৃঙ্গেরী বিধানসভা কেন্দ্র (Sringeri assembly constituency)। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসন থেকে কংগ্রেস প্রার্থী টিডি রাজেগৌড়া মাত্র ২০১ ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির ডিএন জীবরাজকে। এর পর পরাজয়কে চ্যালেঞ্জ করে কর্ণাটক হাইকোর্টে নির্বাচনী পিটিশন (election petition) দাখিল করেন বিজেপি প্রার্থী। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল হাইকোর্ট খারিজ হয়ে যাওয়া ২৭৯টি পোস্টাল ব্যালট (postal ballots) পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন করে গণনার নির্দেশ দেয়।
বিতর্কের আগুনে ঘি পড়ে গত মে মাসে। রিটার্নিং অফিসার হঠাৎ সংশোধিত ফলাফল ঘোষণা করে জানান, গণনার পর রাজেগৌড়ার ২৫৫টি ভোট কমে গিয়েছে এবং বিজেপি প্রার্থী জীবরাজ জয়ী হয়েছেন। এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে বিধায়ক পদ খুইয়ে তড়িঘড়ি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন কংগ্রেস নেতা। তাঁর অভিযোগ, আদালত কেবল বাতিল ব্যালট দেখতে বলেছিল, অথচ রিটার্নিং অফিসার বেআইনি ভাবে তাঁর পক্ষে পড়া ৫৬২টি বৈধ পোস্টাল ব্যালট নতুন করে হিসেবে টেনে এনে বিজেপির জয় নিশ্চিত করেছেন। গত মে মাসেই কংগ্রেস বিধায়ককে স্বস্তি দিয়ে শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত রাজেগৌড়াই ওই আসনের বৈধ বিধায়ক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন।
পোস্টাল ব্যালটে কারচুপির ছায়া
হাইকোর্টের রায় এবং পুনর্গণনার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রমাণের জন্যই ২০২৩ সালের মূল গণনার এবং সম্প্রতি হওয়া পুনর্গণনার সমস্ত ভিডিও রেকর্ডিং (video recordings) এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট (observer’s report) আদালতে তলব করার আর্জি জানিয়েছিলেন রাজেগৌড়া। সেই ভিডিও চাওয়ার মুখেই নির্বাচন কমিশনের তরফে দাবি করা হয় যে ২০২৩ সালের ভিডিওটি তারা খুঁজে পাচ্ছে না।
আদালতে আরও উঠে আসে যে, বিজেপি নেতা জীবরাজের বিরুদ্ধে পোস্টাল ব্যালটে গরমিল করার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছিল, যদিও পরে রাজ্য হাইকোর্ট সেই মামলায় স্থগিতাদেশ দেয়। পুরো বিষয়টিতে যে তীব্র ধোঁয়াশা রয়েছে, তা কমিশনের নথি হারানোর বয়ানে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি পিছিয়ে ২০২৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্দিষ্ট হলেও, তার আগেই গণনার সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ এজলাসে জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।