ভোটাধিকার কোনও মৌলিক নয় বিধিবদ্ধ অধিকার, জানাল সুপ্রিম কোর্ট

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভোটাধিকার কোনও মৌলিক অধিকার নয়। রবিবার বিষয়টি নিয়ে সাংবিধানিক অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট করে দিল দেশের শীর্ষ আদালত। আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ভোট দেওয়ার অধিকার বা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার কোনওটিই মৌলিক অধিকার নয়। এগুলি সম্পূর্ণভাবে আইন দ্বারা নির্ধারিত বিধিবদ্ধ অধিকার, যা নির্দিষ্ট শর্তের আওতায় কার্যকর হয়।

সম্প্রতি রাজস্থানের একটি সমবায় দুধ উৎপাদক সমিতির নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়। বিচারপতি বি ভি নাগরত্না এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত তার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। আদালত জানায়, ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার—এই দুটি আলাদা বিষয়। এগুলি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার নয়, বরং আইন দ্বারা নির্ধারিত বিধিবদ্ধ অধিকার। তাই আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তের মধ্যেই এই অধিকার সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ আইন যতটা অনুমতি দেয়, তার মধ্যেই এই অধিকার কার্যকর হয়।

এই মামলার প্রেক্ষিতে দেখা যায়, রাজস্থানের একটি দুধ উৎপাদক সমবায় সমিতি তাদের পরিচালন সমিতির নির্বাচনের জন্য কিছু উপনিয়ম তৈরি করেছিল। সেখানে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়। এই উপনিয়মকে প্রথমে রাজস্থান হাই কোর্ট বাতিল করে দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়নি। শীর্ষ আদালত জানায়, রাজস্থান সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী, এই ধরনের বিষয় নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।


আদালতের মতে, হাই কোর্ট ওই উপনিয়মকে বাতিল করে ভুল করেছে। কারণ সেখানে ভোটাধিকার সীমিত করা হয়নি। বরং শুধুমাত্র প্রার্থীদের যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট আরও জানায়, যোগ্যতা নির্ধারণ মানে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। যোগ্যতা এবং অযোগ্যতা নির্ধারণ দুটি আলাদা বিষয়, যা আইনি কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত। এই রায়ের ফলে হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। পরিবর্তে সমবায় সমিতির নিজস্ব নিয়মগুলির বৈধতা বহাল রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার কারণে বহু যোগ্য ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, যোগ্য নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করা গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ফের  সামনে এসেছে।

আদালত অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের প্রসঙ্গ টেনে জানায়, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ সম্পূর্ণভাবে আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ ক্ষেত্র। সংসদ বা বিধানসভা প্রণীত আইনের ভিত্তিতেই এই অধিকার কার্যকর হয়। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে অতীতে জ্যোতি বসু বনাম দেবী ঘোষাল মামলার নজির টেনে জানায়, ভোটাধিকার সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে পড়ে না। এই অধিকার সংসদ বা বিধানসভা যে আইন তৈরি করে, তার ভিত্তিতেই ভোগ করা যায়। অর্থাৎ, এই অধিকারে আইন প্রণেতারা চাইলে জনস্বার্থে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে বিশেষ শর্ত আরোপ করতে পারেন।

উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের জ্যোতি বসু বনাম দেবী ঘোষাল মামলা ছিল ভারতীয় রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মামলা। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ সম্পূর্ণভাবে আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি ক্ষেত্র। ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুসারে, এটি কোনও সাধারণ দেওয়ানি মামলা নয়। বরং এটি বিশেষ আইনি প্রক্রিয়া। এই আইন অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাই কেবল মামলার পক্ষ হতে পারেন। তাই কোনও মন্ত্রী বা দলের প্রচারক যদি সরাসরি প্রার্থী না হন, তবে তাঁদের এই বিবাদে পক্ষ করা সম্ভব নয়। এই রায়টিই প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের অধিকার ও তার আইনি মোকাবিলা— সবই একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিষয়টি সাধারণ মৌলিক অধিকারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।