মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ খুব স্বচ্ছ?  প্রধানমন্ত্রীর প্যানেলই সব ঠিক করবে? বিরাট প্রশ্ন তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট

Supreme Court Of India (ANI)

দেশের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ নির্বাচন কমিশন। আর সেই কমিশনের শীর্ষপদে কারা বসবেন, তা ঠিক করার প্রক্রিয়া নিয়েই এবার প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner)-সহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে চলছে টানটান শুনানি। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চ এই মামলাকে অন্য যে কোনও বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে।

কেন্দ্রের হাতেই বেশি ক্ষমতা

২০২৩ সালের একটি আইন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি নির্বাচক কমিটি (Selection Committee) গঠিত হয়। এই কমিটিতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই তিন সদস্যের মধ্যে দু’জনই সরকারপক্ষের প্রতিনিধি। বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধি মাত্র একজন। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রের প্রভাব অনেকটাই বেশি থেকে যাচ্ছে, এমনটাই মনে করছে আদালত।


সিবিআই নিয়োগের সঙ্গে তুলনা

শুনানির সময় বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা টেনেছে। সিবিআই অধিকর্তা (CBI Director) নিয়োগের প্যানেলেও তিনজন সদস্য থাকেন, আর সেখানে ভারতের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India) সরাসরি যুক্ত থাকেন। তাহলে নির্বাচন কমিশনের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্যানেলে কেন কোনও স্বাধীন সদস্য নেই, প্রশ্ন তুলেছে আদালত। বেঞ্চের বক্তব্য, গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে, তার গুরুত্ব আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত।

কেন্দ্রের যুক্তি

কেন্দ্রের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে সওয়াল করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্যানেল খারাপ উদ্দেশ্যে কাজ করবে, এমন ধরে নেওয়াটা ঠিক নয়। তাঁর প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে যদি এতটাই অবিশ্বাস থাকে, তাহলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ও কি কোনও প্রাক্তন বিচারপতি বা বহিরাগত ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়ার বিধান থাকা উচিত নয়। যদিও আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল স্পষ্ট, ন্যায় শুধু হলেই চলে না, তা হয়েছে বলে প্রতীয়মানও হওয়া দরকার।

বৃহত্তর বেঞ্চে মামলা

আপাতত এই মামলা পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চে (Constitution Bench) পাঠানো হবে কি না, সেই বিষয়ে রায় সংরক্ষিত রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। আবেদনকারী এবং কেন্দ্র উভয় পক্ষকেই লিখিত বক্তব্য জমা দিতে বলা হয়েছে। ২০২৩ সালের অনুপ বরনওয়াল মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, সংসদ আইন তৈরি না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত প্যানেলই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবে। পরে কেন্দ্র নতুন আইন এনে প্রধান বিচারপতির জায়গায় একজন মন্ত্রীকে বসিয়ে দেয়। সেই সিদ্ধান্তকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (Association for Democratic Reforms)।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ এমনিতেই তুঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে কোনও প্রশ্ন রাজ্যের ভোটারদের কাছেও সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকলে ভোট পরিচালনা নিয়ে আস্থাও বাড়ে। তাই সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শুধু দিল্লির আইনি লড়াই নয়, রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।