এসআইআরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা প্রকাশের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খেল নির্বাচন কমিশন। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন ও দোলা সেনের করা মামলায় মুখ পুড়ল কমিশনের। এদিন শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি’র যুক্তি দেখিয়ে যাঁদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তাঁদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। প্রশাসনিক কার্যালয়গুলিতে তালিকা টাঙানোর পাশাপাশি অনলাইনেও প্রকাশ করার নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত। শুনানিতে কারও কাছ থেকে নথি গ্রহণ করা হলে তার রসিদ দেওয়ারও কথা বলেছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কমিশনকে গ্রাম পঞ্চায়েত, ব্লক ও ওয়ার্ড অফিসে তালিকা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্লক অফিসে আলাদা কাউন্টার বা নির্দিষ্ট অফিস খুলতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ নথি জমা দিতে পারবেন এবং আপত্তি জানাতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চালাতে রাজ্য সরকারকে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী মোতায়েন করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রতিটি জেলার জেলাশাসককে এই নির্দেশ কঠোর ভাবে কার্যকর করতে বলা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজ্যকে পুলিশি ও আইন-শৃঙ্খলার দিকে নজর দিতে বলেছে শীর্ষ আদালত। এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে দুই সপ্তাহ পরে।

কমিশন জানিয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে ১.৩৬ কোটি ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের শুনানির জন্য তলব করা হবে বলেও জানায় কমিশন। পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৯৪ লক্ষে। সেই তালিকা ধরেই ভোটারদের শুনানির নোটিস পাঠানো হচ্ছে। এদিন শীর্ষ আদালতের বেশিরভাগ পর্যবেক্ষণই তৃণমূলের পক্ষে যায়। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তর এজলাসে মামলাটির শুনানি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে শুনানিতে সওয়াল করেন বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর বক্তব্য, ‘শুনানিকেন্দ্রের সংখ্যা অতি কম, ১৯০০-র বদলে ৩০০ মাত্র’।


বিএলও সংখ্যা শূন্য, তাঁদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দেখুন লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি বলতে কী বলা হচ্ছে। ঠাকুরদা-ঠাকুমার সঙ্গে নাতি-নাতনির বয়সের ফারাককেও এর মধ্যে ধরা হচ্ছে। সকলের নাম ভোটার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নোটিস পাঠানো হচ্ছে। আমাদের দাবি, কারা কেন শুনানির নোটিস পাচ্ছে এবং করে শুনানি, তার বিস্তারিত তালিকা টাঙানো হোক।‘ বানানের সামান্য হেরফেরেও শুনানিতে তলব করা হচ্ছে বলে এদিন তিনি আদালতে জানান। সিব্বলের বিরোধিতা করে কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বলেন, অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে ১৫ বছরের কম ফারাক থাকলে তাঁদের ডাকা হচ্ছে।

তখনই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি প্রশ্ন তোলেন, ‘মা ও সন্তানের বয়স ১৫ বছরের ফারাক কীভাবে লজিক্যাল ডিসক্রিপান্সি হতে পারে? আমরা এমন দেশ বাস করি না, যেখানে বাল্যবিবাহ প্রথা উঠে গিয়েছে।‘ এছাড়া শুনানিকেন্দ্রের প্রবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। এ প্রসঙ্গে এদিন সুপ্রিম কোর্ট জানায়, শুনানিতে হাজিরা দেওয়ার সময় ভোটাররা চাইলে যে কোনও একজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি যদি বিএলএ হন, তাতেও আপত্তির কিছু নেই। অর্থাৎ এবার থেকে শুনানিতে থাকার অনুমতি পেলেন বিএলএরা।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বিজেপি ও কমিশনকে একযোগে আক্রমণ করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘যারা বাংলার মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে তাদের দু’গালে দুটো কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।‘ সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে সভা ছিল অভিষেকের। কাছারি ময়দানে সভা শুরু করার কিছুক্ষণ আগেই সুপ্রিম কোর্ট লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি তালিকা প্রকাশ করার নির্দেশ দেয়।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিজেপির এসআইআর-এর খেলা শেষ।‘ গত ৩১ ডিসেম্বর দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা প্রকাশ করার কথা বলেছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। এদিন সেই সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে যে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে, সব কিছু ঠিক থাকার পরেও হিয়ারিং নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের তালিকা প্রকাশ করুন।‘

কমিশন বলেছিল, ‘আমরা তালিকা প্রকাশ করব না। কারণ, তালিকা প্রকাশিত হলে এদের খেলাটা ধরা পড়ে যেত।‘ নথিপত্র ঠিক থাকার পরেও গত দুই-আড়াই মাস ধরে গরিব এবং বয়স্কদের নাম ভোটার তালিকা থেকে গায়ের জোরে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন অভিষেক।শুনানিকেন্দ্রে বিএলএ-দের উপস্থিতি নিয়েও বারাসতের সভা থেকে অভিষেক বলেন, ‘ওরাল মেনশন চলাকালীন বিচারপতিরাও বলেছেন বিএলএ-২ থাকবেন।‘

অভিষেক আরও জানান, বিএলএ-২ সংক্রান্ত এই দাবি তৃণমূল আগেই জানিয়েছিল কমিশনকে। কিন্তু ওই সময়ে কমিশন তাদের বলে দিয়েছিল, বিএলএ-২ থাকবেন না শুনানিকেন্দ্রে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আসলে বাংলার সাধারণ মানুষের জয় বলে দাবি করেন অভিষেক। বিজেপি এবং কমিশনের আঁতাতের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘এক কোটি মানুষকে বেছে বেছে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেবে বলেছিল। এই জয় সেই খেটে খাওয়া মানুষের জয়, বাংলার জয়, মা মাটি মানুষের জয়।‘

বিজেপিকে নিশানা করে অভিষেকের বলেন, ‘আজ কোর্টে হারালাম, এপ্রিলে ভোটে হারাব।তৈরি থাকো।‘ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে দাবিগুলি নিয়ে সংসদের ভিতরে, বাইরে, জনসভায় সরব হয়েছিলাম, সেই দাবিকে মান্যতা দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বলেছে, শুধু লিস্ট রিলিজই হবে না, গ্রাম পঞ্চায়েত ধরে ধরে তালিকা টাঙাতে হবে। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম। এক কোটি মানুষকে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিত ভাবে মোদী সরকার এবং কমিশন বাদ দিতে চেয়েছিল।‘ শুধু অভিষেক নয়,  কোন যুক্তিতে ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ্যে আনার দাবিও তুলেছিলেন তিনি।