রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর। বকেয়া মহার্ঘ ভাতার ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বাকি মহার্ঘ ভাতার বকেয়া ৭৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য নতুন কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ জানায়, ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার।
২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে ডিএ বকেয়া রয়েছে, এই রায় সেক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তবে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বর্তমানে যে ৪০ শতাংশ ডিএ-র ফারাক, তার সঙ্গে বৃহস্পতিবারের নির্দেশের কোনও সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, তা পুরনো বকেয়া পরিশোধ সংক্রান্ত মামলারই রায়।
গত বছর ১৬ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ রাজ্যেকে বকেয়া মহার্ঘ ভাতার ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট প্রথমে বকেয়া ডিএ-র ৫০ শতাংশ রাজ্যকে দিয়ে দিতে বলে। ৫০ শতাংশ বকেয়া ডিএ দেওয়া এখনই সম্ভব নয় বলে জানান রাজ্যের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। তা হলে রাজ্য চালানো যাবে না বলে জানান তিনি।
আদালতের কাছ থেকে আরও ছ’মাস সময় চাওয়া হয়। সেই আবেদনের ভিত্তিতে আবার শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সেই শুনানিপর্ব শেষ হয়। রায়দান স্থগিত রেখেছিল দুই বিচারপতির বেঞ্চ। বৃহস্পতিবার সেই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। গত বছরের ১৬ মে ২৫ শতাংশ ডিএ দেওয়ার অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট, সেই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর করতে বলেছে আদালত। অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। অর্থাৎ, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে পরিমাণ ডিএ বকেয়া ছিল, তার ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
রাজ্যের আর্থিক সামর্থ্য নেই বলে শুনানি চলাকালীন বার বার দাবি করেন রাজ্য সরকারের আইনজীবী। সব কর্মচারীকে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিলে রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাবে। বৃহস্পতিবারের রায়ে সেই বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের উপর যাতে আর্থিক চাপ না পড়ে সেই বিষয়টি মাথায় রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। কোষাগারে অযথা চাপ না দেওয়ার জন্য একটি পদ্ধতি আদালতের তরফে তৈরি করা হয়েছে। বাকি ৭৫ শতাংশে জন্য চার সদস্যের কমিটি তৈরির নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি করোল এবং বিচারপতি মিশ্রের বেঞ্চ।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রের নেতৃত্বে ওই কমিটি তৈরি হবে। ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তরলোক সিং চৌহান এবং ছত্তিশগড়ের হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি গৌতম ভাদুড়ি তাতে থাকবেন। এ ছাড়াও ওই কমিটিতে রাখা হবে কেন্দ্রের ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল’-এর এক জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে।
কমিটি কী কী দায়িত্ব পালন করবে তাও জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কমিটির মূল দায়িত্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মোট কত টাকা কত বারে দেওয়া হবে তা স্থির করা। কত দিনের মধ্যে কত কিস্তিতে দেওয়া হবে তা ঠিক করা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্ধারিত টাকা ছাড়া হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা। রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই সব কিছু ঠিক করবে ওই কমিটি। আর এই পুরোটাই বকেয়া ডিএ-র ৭৫ শতাংশের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
কত টাকা দেওয়া হবে এবং কী ভাবে দেওয়া হবে তা আগামী ৬ মার্চের মধ্যে কমিটিকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। কমিটির বিবেচনা অনুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থ ৩১ মার্চের মধ্যে দিতে হবে। অর্থাৎ, বকেয়া ডিএ-র ৭৫ শতাংশের মধ্যে কমিটির নির্ধারণ করা প্রথম কিস্তির টাকাও মার্চের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে রাজ্য সরকারকে। প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধের পর রাজ্যকে একটি স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে হবে আদালতে। কমিটি কী কী নির্ধারণ করেছে, টাকা দেওয়ার সময়সূচি এবং প্রথম কিস্তির দেওয়া হয়েছে কি না, ওই রিপোর্টে সব তথ্য জানাতে হবে। আগামী ১৫ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি। আদালত আরও জানিয়েছে, কমিটির খরচও বহন করতে হবে রাজ্য সরকারকে।
২০২০ সালের আগে থেকে কর্মরত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ছাড়া, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরাও এই রায় অনুযায়ী নিজেদের বকেয়া পাবেন। তবে ২০০৯ সালের পর যাঁরা অবসর নিয়েছেন তাঁদের জন্যই এই রায় প্রযোজ্য। অন্য দিকে, ২০১৯ সালের পর যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সময়কার বকেয়া ডিএ পাবেন। কেউ যদি ২০১৪ সালে কাজে যোগ দেন, তবে সেই সময় থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হিসাবে বকেয়া ডিএ পাবেন।
ডিএ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তাঁরা ডিএ পাওয়ার যোগ্য। অল ইন্ডিয়া কনজিউমার্স প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী হিসেব করতে হবে ডিএ-র। রাজ্য নিজের মতো করে হিসেব করতে পারবে না। রোপা আইন যেহেতু এআইসিপিআই অন্তর্ভুক্ত, তাই অবশ্যই তার মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
মহার্ঘ ভাতাকে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের ‘মৌলিক অধিকার’ বলে উল্লেখ করেছিল। ডিএ মৌলিক অধিকার কি না এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। তাই এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট কোনও মন্তব্য করবে না বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে মামলা হলে তখন আদালত মত দেবে বলে জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালতের এই রায়ে স্বাভাবিকভাবেই খুশি আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীরা। ধর্মতলায় তাঁদের অবস্থানমঞ্চে লাড্ডু বিলি করা হয়। ডিএ মামলায় অন্যতম পক্ষ সরকারি কর্মচারীদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। সংগঠনের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, ‘আমরাও যাতে কমিটির সঙ্গে বসতে পারি, সেই আবেদন করব। সরকারের আর্থিক স্বাস্থ্য যে মোটেই খারাপ নয়, বরং (ডিএ) দেওয়া যায়— আমরা সেই তথ্য তুলে ধরব।‘
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতিও। সংগঠনের অন্যতম নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়কে আমরা স্বাগত জানাই। এটাই হওয়ার ছিল। দীর্ঘ দশ বছরের লড়াইয়ের পর এই জয় শুধু আমাদের রাজ্যের শিক্ষক কর্মচারীদের জয় নয়, সারা দেশের কর্মচারীদের জয়।‘
অন্য দিকে, তৃণমূল সমর্থিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বায়ক প্রতাপ নায়েক বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে নির্দেশ দিয়েছে, তা নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। মুখ্যমন্ত্রী তো কোনও দিন বলেননি যে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দেবেন না। আমাদের বিশ্বাস সময়-সুযোগ বুঝে তিনি নিশ্চয়ই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ-র দাবি পূরণ করতেন। এখন যখন আদালত নির্দেশ দিয়েছে, তখন রাজ্য সরকার যে ভাবে সেই নির্দেশ পালন করবে, সেই প্রক্রিয়ার পাশে আমরা থাকব।‘