দিল্লির রাজপথে ফের নামছে প্রতিবাদের ঢল। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়া গেট থেকে দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party) বা সিজেপি (CJP)। সেই মিছিল আটকাতে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থ হয়েছিলেন দিল্লি পুলিশের এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসার।তাঁর দাবি ছিল, ঝামেলা হতে পারে ওই দিন, তাই মিছিল করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করুক সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (CJI Surya Kant) নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। শীর্ষ আদালতের স্পষ্ট বার্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত সরকার ও পুলিশের, আদালতের নয়।
কী চেয়েছিলেন মামলাকারী
মামলা দায়ের করেছিলেন দিল্লি পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার রাজেন্দ্র সিংহ। তাঁর আইনজীবী রিজান আহমেদের যুক্তি ছিল, ইন্ডিয়া গেট ও সেন্ট্রাল ভিস্তার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় পুলিশের অনুমতি ছাড়া কোনও বড় জমায়েত বা মিছিল হতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি আদালতকে মনে করিয়ে দেন, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বসছে ব্রিকস সম্মেলন (BRICS Summit)। সেই সময় বিদেশি রাষ্ট্রনেতা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতির কথা মাথায় রেখেই নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি বলে তাঁর দাবি। প্রসঙ্গ টেনে আনা হয় গত ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ মিছিলে হওয়া হিংসার ঘটনাও। মামলাকারীর বক্তব্য ছিল, সিজেপি এখনও পর্যন্ত মিছিলের জন্য পুলিশি অনুমতি নেয়নি।
সুপ্রিম জবাব
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এখনই কিছু অপ্রীতিকর ঘটবে বলে ধরে নেওয়ার কোনও কারণ আদালতের সামনে নেই। তাঁর পর্যবেক্ষণ, আপাতত ধরে নেওয়া হোক, সকলেই শান্তিপূর্ণ আচরণ করবেন। এই মুহূর্তে এমন কোনও জোরালো পরিস্থিতি নেই, যাতে অনভিপ্রেত কিছু ঘটবে বলে ধরে নেওয়া যায়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ কেন্দ্র এবং দিল্লি পুলিশকে নোটিস পাঠিয়েছে ঠিকই, তবে ৫ সেপ্টেম্বরের আগে মামলার শুনানির আর্জি খারিজ করে দিয়েছে। মামলাটি আপাতত পড়ে থাকছে ১০ সেপ্টেম্বর, ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত অন্যান্য মামলার সঙ্গেই একত্রে শুনানির জন্য।
ককরোচ জনতা পার্টির লড়াই
উল্লেখ্য, ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম আসলে একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে। এ বছর মে মাসে এক মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার যুবসমাজকে নিয়ে এমন এক মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই মন্তব্যকেই কটাক্ষ করে জন্ম নেয় এই আন্দোলন। প্রথমে এটি নিছক একটি কৌতুকপূর্ণ অনলাইন সংগঠন হিসেবে শুরু হলেও, পরে তা রূপ নেয় নিট (NEET) পরীক্ষার অনিয়ম এবং পুলিশি বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে যুব আন্দোলনে। গত ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে, যার জেরে বহু প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়। সিজেপি-র অভিযোগ, ২৫ জুলাই কেন্দ্রের তরফে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার একটিও এখনও পূরণ হয়নি। এফআইআর প্রত্যাহার এবং আত্মঘাতী পরীক্ষার্থীদের পরিবারের প্রতি ন্যায়বিচারের দাবিতেই আগামী ৫ সেপ্টেম্বরের এই মিছিল।
পুলিশের অবস্থান কী
দিল্লি পুলিশ এখনও পর্যন্ত ইন্ডিয়া গেট থেকে পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত কোনও মিছিলের আবেদন হাতে পায়নি বলে সূত্রের খবর। বদলে রামলীলা ময়দানের মতো নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলে কর্মসূচি সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে সিজেপি সাফ জানিয়েছে, মিছিল হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, এবং ছাত্রছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মকে বেশি সংখ্যায় অংশ নেওয়ার ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। অন্য দিকে সম্ভাব্য বড় জমায়েতের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঝালিয়ে নিচ্ছে পুলিশ প্রশাসনও।
কেন এই মামলা গুরুত্বপূর্ণ
শীর্ষ আদালতের এই অবস্থান একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার যেমন সুরক্ষিত থাকা জরুরি, তেমনই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে নিরাপত্তার প্রশ্নও অগ্রাহ্য করা যায় না। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, আশঙ্কার ভিত্তিতে আগেভাগে কোনও নাগরিক অধিকার খর্ব করা তার কাজ নয়। বল এখন পুরোপুরি দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোর্টে। আগামী কয়েক দিনে মিছিলের অনুমতি, রুট এবং নিরাপত্তা বন্দোবস্ত নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসনের কাছে।