আসামে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও বিপর্যয় এখনও কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনও প্রাণহানির খবর নেই। আসাম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির মঙ্গলবার প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যের ছয়টি জেলায় মোট ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪৯৫ জন মানুষ বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
এখনও শিবসাগর, গোলাঘাট, চরাইদেও, যোরহাট এবং কামরূপ (মেট্রোপলিটন)-সহ একাধিক এলাকায় জলবন্দি পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। যদিও রবিবারের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এ বছরের বন্যায় মোট মৃতের সংখ্যা এখনও ৬৮-তেই রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চরাইদেও জেলায়, যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৪০৪ জন মানুষ বন্যার কবলে। শিবসাগরে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৪৬১ এবং যোরহাটে ৭৪ হাজার ৪৫৮ জন।
দুর্গতদের জন্য রাজ্যজুড়ে ৯০টি ত্রাণশিবির চালু রয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৮ হাজার ৬৯৫ জন। পাশাপাশি ৯৪টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে দুর্গতদের হাতে।
এএসডিএমএ জানিয়েছে, গোলাঘাট জেলার নুমালিগড়ে ধানসিরি (দক্ষিণ) নদীর জল এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। উদ্বার ও ত্রাণকাজে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ) এবং সিভিল ডিফিন্সের কর্মীরা যৌথভাবে কাজ করছেন। দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে ৬৭টি নৌকা।
বন্যার জেরে এখনও প্রায় ৩৭ হাজার ১৩৯.৫২ হেক্টর কৃষিজমি জলে নিচে। ভেসে গিয়েছে ২৬ হাজার ৬৭৯টি গবাদি পশু। বহু এলাকায় রাস্তা, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দুর্গতদের অবস্থা এখনও অত্যন্ত সঙ্কটজনক। অনেক জায়গায় রান্না করার মতো নিরাপদ জায়গা না থাকায় ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। যোরহাটের এক বাসিন্দা জানান, বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিও নদীর মতো জলমগ্ন হয়ে রয়েছে।
শিবসাগরের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বহু কাঁচা বাড়ি ভেসে গিয়েছে, অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি। এক স্থানীয় তরুণীর কথায়, অনেকেই জলবন্দি অবস্থায় ঘরের ভিতরে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন ধাপে ধাপে তাঁদের ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আসামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জু খাড়্গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁরা দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে বিজেপির পূর্বের বন্যামুক্ত আসাম গড়ার প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে তার বাস্তবায়নের প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্রের বিশাল জলপ্রবাহ, প্রবল বর্ষা এবং আসামের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতিবছর বন্যা পুরোপুলি রোধ করা সম্ভব নয়। তবে জলাভূমি সংরক্ষণ, বাঁধ সংস্কার, উন্নত বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিকল্পনাহীন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে বলে মত।