ভাল্লার বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া সমস্ত নামকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া ভোটার, ভুয়ো নাম এবং একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধনের মতো কারণেও নাম বাদ পড়েছে। ফলে মোট ছাঁটাইয়ের সংখ্যা এবং প্রকৃত যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার সংখ্যা এক নয়।
১৩.৩৭ কোটি নাম বাদ, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কি অনিয়ম?
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, SIR-এর বিভিন্ন পর্বে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে মোট ১৩.৩৭ কোটি নাম বাদ পড়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় পর্বে বিহার-সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে ৭.২২ কোটি এবং তৃতীয় পর্বে ১৭টি রাজ্য থেকে ৬.১৫ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়।
রয়টার্সের তথ্য উদ্ধৃত করে ভাল্লা উল্লেখ করেছেন, এই ছাঁটাইয়ের প্রাথমিক তালিকায় প্রায় ২.৮ কোটি মৃত ব্যক্তি, ৬.৩ কোটি স্থানান্তরিত ব্যক্তি, ১ কোটি ভুয়ো বা ডুপ্লিকেট নাম এবং ৩ কোটি নিখোঁজ ভোটারের তথ্য ছিল। এই তালিকা তৈরি হয়েছিল দাবি ও আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়ার আগেই।
তাই তাঁর মতে, বাদ পড়া ১৩ কোটিরও বেশি নামের প্রতিটিকেই ভুলবশত বাদ দেওয়া হয়েছে বলে বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্ন হল, যাঁরা ভোট দেওয়ার যোগ্য, তাঁদের কতজনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়নি।
কীভাবে ৭০ লক্ষের হিসাব করলেন সুরজিৎ ভাল্লা?
ভাল্লার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০০.৮ কোটি। তবে দেশের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত থাকেন না। ভোটার হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও নিবন্ধন না করানোর প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি হিসাব করেছেন, প্রায় ৮.৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনও দিনই ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হননি।
এই অনুমানের ভিত্তিতে তাঁর মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকায় প্রায় ৯২.২ কোটি নাম থাকা প্রত্যাশিত।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে এমন ৯টি বড় রাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভাল্লা জানান, সেখানে প্রত্যাশিত ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৩.৫১ কোটি। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নাম রয়েছে ৫২.৭৮ কোটি মানুষের। অর্থাৎ, প্রায় ৭৩ লক্ষ নামের ঘাটতি রয়েছে।
এই হিসাব থেকে আইনত বাদ দেওয়া প্রায় ৫ লক্ষ অ-নাগরিকের নাম বাদ দিলে প্রায় ৭০ লক্ষ যোগ্য ভোটারের নামের ঘাটতি থেকে যায়, যার যথাযথ ব্যাখ্যা তাঁর বিশ্লেষণে মেলেনি।
ভাল্লার বক্তব্য, মোট ছাঁটাইয়ের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম। তাঁর মতে, বাদ পড়া প্রতি আটটি নামের মধ্যে প্রায় সাতটি বাদ দেওয়ার যথাযথ কারণ ছিল। তবে সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও সংশ্লিষ্ট ভোটারদের কাছে এর গুরুত্ব কোনওভাবেই কম নয়।
SIR-এ পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ
জাতীয় স্তরের হিসাবের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিকে ব্যতিক্রমী বলে চিহ্নিত করেছেন সুরজিৎ ভাল্লা। তাঁর অনুমান, রাজ্যে প্রায় ৫০ লক্ষ যোগ্য ভোটারের নাম ব্যাখ্যা ছাড়াই বাদ পড়ে থাকতে পারে। এই সংখ্যা রাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের সমান।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার সংখ্যা ৭.৬৬ কোটি থেকে কমে ৬.৭৭ কোটিতে নেমেছে, যা প্রায় ১১.৬ শতাংশ হ্রাস। অন্যদিকে, তাঁর গণনা অনুযায়ী, রাজ্যে প্রত্যাশিত ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭.৩৩ কোটি।
এ ছাড়া, এপ্রিল মাসে ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভাল্লার উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, এই বাদ পড়া নামগুলির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ছিল।
সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২.২ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনগুলির প্রায় ৯৩ শতাংশ আবেদনকারীকে যোগ্য বলে প্রমাণিত করা হয়েছিল। এই তথ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি ও বাদ পড়া নামগুলির যথাযথ যাচাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিহারের চিত্র কেন আলাদা?
SIR নিয়ে প্রথম বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বিহারকে কেন্দ্র করে। তবে ভাল্লার বিশ্লেষণে সেই রাজ্যের পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় আলাদা।
তাঁর দাবি, বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এখনও প্রায় ৬০ লক্ষ অতিরিক্ত নাম থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করেছেন। কর্মসূত্রে অন্যত্র চলে গেলেও তাঁদের নাম নিজ রাজ্যের ভোটার তালিকায় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে যেখানে পশ্চিমবঙ্গে যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে বিহারে একই ব্যক্তির একাধিক স্থানে নিবন্ধন বা স্থানান্তরের তথ্য যথাযথভাবে হালনাগাদ না হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রয়োজন, কিন্তু পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
সুরজিৎ ভাল্লার সামগ্রিক বক্তব্য হল, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, ভুয়ো ও অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর বিশ্লেষণে জাতীয় স্তরে ব্যাখ্যাহীন ছাঁটাইয়ের সংখ্যা ১৩ কোটির তুলনায় অনেক কম বলে উঠে এলেও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষত, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের আপিলের সুযোগ, আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটার তালিকা স্বচ্ছ ও নির্ভুল করা যেমন জরুরি, তেমনই সেই কাজের পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়া এবং প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখাও গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত।