মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর মতপার্থক্য ঘিরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই কমিশনার। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল এবং এসআইআর চলাকালীন ভোটার নথিভুক্তির পদ্ধতি নিয়েও তাঁদের আপত্তির কথা উঠে এসেছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই সরব হয়েছেন দুই প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি এবং অশোক লাভাসা। তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগগুলি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। তাই বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারেরই বিষয়টি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা উচিত বলে মত তাঁদের।
‘তিন কমিশনারের সাংবাদিক বৈঠক হোক’
প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশির প্রস্তাব, তিন নির্বাচন কমিশনারকে একসঙ্গে সাংবাদিক বৈঠক করে গোটা বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী এসআইআর নিয়ে ঠিক কী আপত্তি জানিয়েছিলেন, তা তাঁদের নিজেদের মুখে জানানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
কুরেশির বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যদি সত্যিই কোনও গুরুতর ভুল হয়ে থাকে, তা হলে আইন মেনে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ খোলা রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, অতীতে যে ভাবে এসআইআরের ক্ষেত্রে পুরনো ভোটার তালিকাকে ভিত্তি করা হয়েছিল, প্রয়োজন হলে ২০২৫ সালের এসআইআরের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে না কেন?
কুরেশির মতে, নির্বাচন কমিশন কেবল একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সমার্থক নয়। কমিশন একটি তিন সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিন সদস্যের মতামত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে।
‘স্বচ্ছতাই কমিশনের শক্তি’
অশোক লাভাসার বক্তব্যও একই সুরে। তাঁর মতে, এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। দুই কমিশনারের আপত্তিগুলি আদৌ বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেগুলি নথিভুক্ত হয়েছিল কি না এবং সেই আপত্তি নিয়ে কমিশনের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
বিশেষ করে নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এবং নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের ক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তারও ব্যাখ্যা চেয়েছেন লাভাসা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, ফর্ম ৬-এ এসআইআর সংক্রান্ত নতুন ঘোষণা যুক্ত করা নিয়ে দুই কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং সেটিকে ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
লাভাসার বক্তব্য, কমিশনের ভিতরে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য কী ভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ নির্বাচন পরিচালনাকারী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাই আস্থার অন্যতম ভিত্তি।
২০১৯-এর স্মৃতি টেনে ফের প্রশ্ন
এই বিতর্কে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্যের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। সে সময় অশোক লাভাসা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে লিখিত মত দিয়েছিলেন বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এসেছে। পরে কমিশনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর মতের অমিল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। লাভাসা পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনারের পদ ছেড়ে দেন।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই ঘটনার সরাসরি তুলনা না টেনেও লাভাসার বক্তব্য, এসআইআর নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর নির্বাচন কমিশনের তরফে নথি ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রকাশ্যে দেওয়া প্রয়োজন।
অন্য এক প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও পি রাওয়াতও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের সিদ্ধান্ত সাধারণত ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। তাঁর মতে, এসআইআর ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বহু সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মতামত, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার স্বাভাবিক অংশ। কমিশনের দাবি, এসআইআর-সহ সাম্প্রতিক সমস্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তিগুলির পর কী ভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল কমিশন? সেই প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে দেওয়া হবে কি না, নজর থাকবে তার দিকেই।