বিতর্ক ধামাচাপা দিতে মরিয়া নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলাকালীনই বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল কোণঠাসা নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India, ECI)। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision, SIR) প্রক্রিয়ায় যাঁরা নোটিস পেয়েছেন, তাঁদের আর নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের (Electoral Registration Officer, ERO) দফতরে সশরীরে হাজির হতে হবে না। শনিবার এক প্রেস নোটে এই কথা জানাল কমিশন। ব্যতিক্রম শুধু কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে। SIR চলাকালীন যাঁরা নোটিস পেয়েছেন, তাঁদের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকদের সামনে সশরীরে হাজিরা দিতে হবে না বলে শনিবার জানিয়েছে কমিশন।
কাদের জন্য এই ছাড়?
যাঁদের নাম তালিকায় ঠিকমতো মেলানো যায়নি, কিংবা যাঁদের নথিতে কিছু অসংগতি ধরা পড়েছে, মূলত তাঁদের ক্ষেত্রেই এই ছাড় কার্যকর হবে। সংশোধিত প্রক্রিয়ায় যে সব ভোটারের রেকর্ড মেলানো যায়নি বা যুক্তিগত অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে, তাঁদের সাধারণত নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের সামনে হাজির হতে হবে না। বুথ স্তরের আধিকারিকরাই (Booth Level Officer, BLO) বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করবেন, নথি তুলে নেবেন। তারপর তা আপলোড হবে কমিশনের ডিজিটাল পোর্টাল ইসিনেটে (ECINet)।
শুনানির সত্যিকারের প্রয়োজন হলে তা হবে ঠিকই, তবে কমিশনের পরামর্শ, সেটাও যেন যতটা সম্ভব অনলাইনেই হয়। ভোটার চাইলে তাঁর হয়ে হাজিরা দিতে পারবেন পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যও। প্রান্তিক ও শারীরিক ভাবে দুর্বল ভোটারদের জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র এবং শিবিরের ব্যবস্থাও করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের (District Election Officer, DEO)।
অ্যাপ ঘিরে বিতর্ক, স্বতন্ত্র কমিটির নজরদারি
ইসিনেট নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। সেই অভিযোগের মাঝেই এবার একটি কমিটি গড়ল কমিশন। এক জন সিনিয়র উপ নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে তৈরি এই কমিটিতে থাকবেন আইআইটির (IIT) এক জন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞও। একজন সিনিয়র উপ নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে এবং আইআইটির একজন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ সমন্বিত একটি কমিটি খতিয়ে দেখবে ইসিনেট আইন ও বিধি মেনে চলছে কি না। অর্থাৎ, প্রযুক্তি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছিল ভিতরে ভিতরে, তা যে একেবারে অমূলক নয়, সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট এই সিদ্ধান্তে।
কমিশনের অন্দরে ফাটলের জল্পনা
যে রিপোর্টে তোলপাড় দেশ যে কমিশনের অন্দরে নাকি মতান্তর তৈরি হয়েছে, তাতে এদিন জল ঢালার চেষ্টাও করা হয়েছে। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) ও বিবেক জোশী (Vivek Joshi) নাকি মন্ত্রিসভা সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন, তাতে একাধিক অসংগতির কথা তুলে ধরে। শনিবার সেই জল্পনায় জল ঢালার চেষ্টা করল কমিশন নিজেই। জানানো হল, স্যারের সমস্ত সিদ্ধান্তই তিন কমিশনারের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। ওই চিঠি কোনও নীতিগত বিষয় নিয়ে ছিল না, বরং একজন অন্য আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে ছিল বলেই দাবি কমিশনের। প্রেস নোটে কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশীর মন্ত্রিসভা সচিবকে পাঠানো চিঠি কমিশন বা তার তথ্যপ্রযুক্তি শাখা সংক্রান্ত কোনও নীতিগত বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, বরং অন্য এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে ছিল।
এখানেই লুকিয়ে আসল বার্তাটা। বিতর্ক যখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে, ভাবমূর্তি রক্ষায় তড়িঘড়ি সক্রিয় হতে হয়েছে কমিশনকে। এক দিনে হাজিরার নিয়ম শিথিল করা, ইসিনেট পর্যালোচনার কমিটি গড়া এবং অন্দরের ফাটল নিয়ে সাফাই, তিনটি সিদ্ধান্তই এসেছে একসঙ্গে, একই প্রেস নোটে। বিরোধীদের চাপ এবং আদালতের নজরদারি, দুইয়ের সামনেই কমিশন যে নিজেকে স্বচ্ছ প্রমাণ করতে মরিয়া, তা বলাই যায়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে জরুরি
পশ্চিমবঙ্গে স্যারের কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে রাজ্যে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছিল, কোনও নোটিস বা শুনানি ছাড়াই। ২০২৫ সালের বিশেষ সারসংক্ষেপ সংশোধনের পরে রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা যেখানে ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯, খসড়া তালিকায় তা নেমে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬১৬ জনে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থও হয়েছেন। তাঁর আইনজীবী কপিল সিব্বলের অভিযোগ, হোয়াটসঅ্যাপের মতো অস্বীকৃত মাধ্যমে বুথ স্তরের আধিকারিকদের নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে, যার কোনও আইনি ভিত্তি নেই।
শনিবারের এই ঘোষণা তাই রাজ্যের প্রেক্ষাপটে বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে। যদিও নতুন নিয়ম মূলত প্রযোজ্য হবে দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের মতো যে সব রাজ্যে দাবি ও আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া এখনও চলছে, সার্বিক নীতি হিসেবে এটি গোটা দেশেই কার্যকর থাকার কথা। মহারাষ্ট্রে দাবি ও আপত্তি জমা দেওয়ার সময়সীমা ১২ অক্টোবর এবং তা নিষ্পত্তির সময়সীমা ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অনুরোধেই।
এখন পর্যন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে স্যার
দেশের ২০টির বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্যার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে, তার মধ্যে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে। বাকি রাজ্যগুলিতে ধাপে ধাপে চলছে কাজ, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা গড়িয়েছে অক্টোবর, নভেম্বর এমনকি ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে চলছে একাধিক মামলা, যেখানে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের সাংবিধানিক এক্তিয়ার নিয়েও।
মোদ্দা কথা, ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার লক্ষ্য যতই মহৎ হোক, প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বস্তি যে কমিশনকেও কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য করেছে, শনিবারের সিদ্ধান্তই তার প্রমাণ।