দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এল। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী। একই দিনে চার বার আপত্তি জানানোর ঘটনাও রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের অজ্ঞাতসারে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডার পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা প্রস্তুতির কাজে ব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে ক্রমশ কেন্দ্রীয়করণের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দুই কমিশনার। তাঁদের বক্তব্যের প্রতিলিপি দেওয়া হয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও।
ফর্ম ৬-এ কী বদল?
নতুন ভোটার হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ব্যবহার করা হয় ফর্ম ৬। চলতি বছরের জুলাইয়ে নির্বাচন কমিশনের ইসিনেট পোর্টালে এই ফর্মের অনলাইন সংস্করণে নতুন একটি ঘোষণা-অংশ যুক্ত হয়। সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে বলা হয়, তাঁর নিজের নাম অথবা বাবা-মা কিংবা দাদু-দিদার নাম আগের এসআইআরের সময় তৈরি ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
আবেদনকারীকে তিনটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়—আগের এসআইআরের তালিকায় নিজের নাম ছিল, বাবা-মা বা দাদু-দিদার নাম ছিল, অথবা তাঁদের কারও নামই ছিল না। অংশটি আলাদা করে বাধ্যতামূলক বলে চিহ্নিত না থাকলেও উত্তর না দিলে অনলাইন আবেদন জমা দেওয়া যাচ্ছিল না।
আপত্তি কোথায়?
এই পরিবর্তন নিয়েই মে মাসে আপত্তি জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী। ১৬ মে তাঁর নোটে বলা হয়, এসআইআর-এর জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ফর্মগুলি ওই বিশেষ প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি এবং সেগুলি আইনসিদ্ধ বিধির অংশ নয়। কিন্তু ফর্ম ৬ ও ফর্ম ৮ আইনসিদ্ধভাবে নির্ধারিত। ফলে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধন না করে এই দুই ফর্মে পরিবর্তন আনা যায় না বলে তিনি মত দেন।
যোশীর মতে, বিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানোই হবে আইনসম্মত ও টেকসই পথ। ১৯ মে তাঁর এই অবস্থানের সঙ্গে সহমত জানান সান্ধুও।
কিন্তু তার পরেও জুলাইয়ে সংশোধিত ফর্ম ৬ ইসিনেট পোর্টালে দেখা যায়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ১৩ আগস্ট সান্ধু ফের লিখিত আপত্তি জানান। প্রতিবেদনের দাবি, আগের নথিভুক্ত মতামতের কথা উল্লেখ করে তিনি পরিবর্তনটিকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেন এবং অবিলম্বে তা সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
শুধু ফর্ম ৬ নয়, আরও একাধিক বিষয়ে আপত্তি
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুই কমিশনারের আপত্তি শুধু ফর্ম ৬-এ সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া, পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন এবং ভোটার-তথ্যভান্ডারে কারা কীভাবে প্রবেশাধিকার পাবেন—এসব বিষয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকার তথ্য পরিচালনায় রাজ্য ও মাঠপর্যায়ের নির্বাচন আধিকারিকদের ভূমিকা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে দিল্লিকেন্দ্রিক করার প্রবণতা নিয়েও আপত্তি উঠেছে। দুই কমিশনার এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ আমলার কাছেও উদ্বেগ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এসআইআর নিয়ে বাইরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি এবার প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলির বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।